
আবদুল জলিল :
মানাস। ধুনটের বুকে বয়ে চলা এক জলধারার নাম। নদীর স্বচ্ছতোয়া ধারার মতোই এই নামে বছর খানেক পূর্বে একজন প্রবীন সাংবাদিকের হাত ধরে শুরু হয়েছে “মানাস মিডিয়া”র পথচলা। উদ্দেশ্য একটাই – এলাকার মানুষের কথা, কষ্ট আর সম্ভাবনার কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এই ফেসবুক ভিত্তিক নিউজ পেজের প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। মাত্র ১ বছরে ধুনট-শেরপুর-সারিয়াকান্দি আর কাজিপুরের মানুষের কাছে “মানাস মিডিয়া” এখন আস্থার আরেক নাম হয়ে উঠেছে।
যেভাবে এলো মানাস মিডিয়া:
মানাস মিডিয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা প্রবীণ সাংবাদিক রফিকুল আলম। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় কাজ করছেন। কিন্তু পেশাগত জীবনের শেষ বেলায় এসে তার মনে হলো, “আমার মাটির খবরগুলো তো ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছায় না। এলাকার মানুষের কানে বাজে না “ এই জানানোর মানসিকতা থেকেই ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি ফেসবুকে পেজ খুললেন। নাম দিলেন “মানাস মিডিয়া”। সাথে নিলেন একঝাঁক তরুণ, নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিককে। কারো হাতে ক্যামেরা, কারো হাতে টাইপট, কারো হাতে কলম। লক্ষ্য একটাই – দালালি না, চাটুকারিতাও না। শুধু বস্তুনিষ্ঠ ভিডিও নিউজ।
রফিকুল আলম বলেন, “মানাস নদী যেমন ধুনটের কৃষকের ফসল বাঁচায়, তেমনি আমরা চেয়েছি সংবাদের মাধ্যমে মানুষের অধিকার বাঁচাতে। তাই নদীর নামেই পেজের নাম দিয়েছি।”
মানাস মিডিয়া টিম ধুনটের অলি-গলি চষে বেড়িয়েছে। কোথায় রাস্তা ভেঙে গেছে, হাসপাতালে ডাক্তার, বা চিকিৎসাসেবার ঘাটতি, বাজারে সিন্ডিকেট অবৈধ বাড়িঘর, জমি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, অসহায় মানুষের উপরে জুলুম অত্যাচার, বিচার পাচ্ছে না নির্যাতিতরা এসব নিয়ে মানাস টিম কাজ করেছে। পাশাপাশি লাইভে গিয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ফলে অনেক জায়গায় দ্রুত সমাধানও এসেছে। সম্ভাবনাময় খবরগুলো ফলাও করে প্রচার করে মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছে।

যেসব সংবাদ মানাস মিডিয়াকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে:
ধুনটের কৃষক নতুন পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করছে, একটা মেয়ে ইউটিউব করে সংসার চালাচ্ছে, নারী উদ্যোক্ত হয়ে সংসারের হাল ধরেছেন, কিংবা স্থানীয় মেলার ঐতিহ্য – এই ইতিবাচক খবরগুলো মানাস মিডিয়া সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে।আবার মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও মানাস কাজ করেছে। গত ১ বছরে মানাসে প্রচারিত কয়েকটি সংবাদের পর অসহায় মানুষ সরকারি সহায়তা পেয়েছে। যমুনার তীরের প্রতিবন্ধী রাজ্জাক মোমেনা দম্পতির খবর প্রচারের পর উপজেলা প্রশাসন তাদের ঘর করে দিয়েছে। ভাঙাচোরা রাস্তার খর প্রচারের পর প্রশাসন সেখানে উন্নয়ন কাজ করেছে।বিদেশে গিয়ে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলো জোড়শিমুল গ্রামের শাহাদত হোসেন। কিন্তু বিধি বাম। সেখানে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু লাশ দেশে আনা যাচ্ছিলো না। মানাস মিডিয়ায় সংবাদ প্রচারের পর প্রশাসন লাশ নিয়ে এসে দাফনের ব্যবস্থা করেছে। মানাস মিডিয়ায় সংবাদ প্রচারের পর স্বামী হারানো এক নারী খুঁজে পেয়েছে তার স্বামীকে।

এভাবেই মানাস মিডিয়া শুধু সংবাদের খাতিরে সংবাদ নয়, আস্থার বার্তাও মানুষকে পৌঁছে দিচ্ছে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে পর্দার আড়ালের মানাস মিডিয়ার একঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ সংবাদকর্মীর প্রচেষ্ঠায়। বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে তারা নিউজ কভার করে।
সংবাদ প্রচারে নিরপেক্ষতার নীতি:
সংবাদের ক্ষেত্রে মানাস মিডিয়া সত্য যাচাই করে তা প্রচার করে। কোনো গুজব নয়, দুই পক্ষের কথা শোনা – নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, মানুষকে হয়রানি না করা – সর্বোপরি ভিকটিমের সম্মান বজায় রেখে সংবাদ প্রচারের নীতি তারা বজায় রেখেছে। সম্পাদক রফিকুল আলম নিজে প্রতিটি ভিডিও দেখে তারপর আপলোডের অনুমতি দেন।
দর্শকের ভালোবাসা: মাত্র ১ বছনের ১০কে ছাড়িয়েছে মানাস মিডিয়ার ফলোয়ার। প্রতিটি ভিডিওতে গড়ে রয়েছে হাজার হাজার ভিউ। কমেন্টে মানুষ লেখে, “ধুনটের খবর এখন মানাসেই পাই”। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ এখন সমস্যা তুলে ধরে সমাধানের মাধ্যম হিসেবে মানাসের ইনবক্সে নক করে। “ভাই, আমাদের গ্রামের রাস্তাটার একটা ভিডিও করেন” – এই বিশ্বাসটা ১ বছরে অর্জন করেছে তারা।
তবে এ পথে মানাসকে অনেক সমস্যাও মোকাবেলা করতে হয়েছে। শুরু থেকে চ্যালেঞ্জ আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পথটা সহজ ছিল না।বিরোধিতা, কখনোবা প্রভাবশালীদের চাপ – মোকাবেলা করেই টিকে আছে মানাস।
শেষ কথা:নদী যেমন থেমে থাকে না, তেমনি মানাস মিডিয়াও থেমে থাকতে চায় না। গুণী সম্পাদক, সাংবাদিক রফিকুল আলমের নেতৃত্বে একদল তরুণ প্রমাণ করে দিচ্ছে – সাংবাদিকতা করতে বড় অফিস লাগে না, লাগে সততা আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা।এই বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে গত ১ বছরেই তারা দেখিয়েছে লোকাল নিউজও জাতীয় ইস্যু হতে পারে। একটা ভিডিও একটা পরিবারের জীবন বদলে দিতে পারে।আগামী দিনগুলোতে “মানাস মিডিয়া” গণমানুষের কণ্ঠ হয়েই বেঁচে থাকুক। নদীর মতোই বয়ে যাক মানাস মিডিয়ার সত্যের স্রোত। সে পথে সতত শুভকামনা। #
লেখক- সহকারী অ্ধ্যাপক, কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিল্পী