
ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ-
কৃষির সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে অব্যবহৃত জমিতেও
বাংলাদেশ কৃষি নির্ভর দেশ। এ দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। অথচ আমাদের চারপাশে এমন অনেক জমি রয়েছে, যেগুলো বছরের পর বছর কোনো উৎপাদন ছাড়াই পড়ে থাকে। কোথাও বাড়ির পাশের জমি, কোথাও পুকুরপাড়, কোথাও জমির আইল, আবার কোথাও একেবারে ছোট ছোট খণ্ড জমি-যেগুলোকে আমরা ‘পতিত’ বলে পাশ কাটিয়ে যাই। কিন্তু একটু পরিকল্পনা, সামান্য বিনিয়োগ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগেই এসব জমি হয়ে উঠতে পারে উৎপাদন ও আয়ের অন্যতম উৎস।
১. পতিত জমি আসলে সম্ভাবনার জমি ‘পতিত জমি’ শব্দটির মধ্যেই যেন অনুৎপাদনশীলতার একটি ধারণা লুকিয়ে আছে। বাস্তবে জমি পতিত নয়, আমাদের পরিকল্পনাই অনেক সময় পতিত থাকে। যে জমিতে বড় ফসল চাষ সম্ভব নয়, সেখানে শাক-সবজি, মসলা, ডাল জাতীয় ফসল কিংবা স্বল্পমেয়াদি ফসল উৎপাদন করা যেতে পারে। একটি ছোট জমি থেকে হয়তো বিপুল পরিমাণ আয় সম্ভব নয়; কিন্তু হাজার হাজার ছোট পতিত জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনা গেলে জাতীয় কৃষি উৎপাদনে এর সম্মিলিত অবদান হতে পারে উল্লেখ যোগ্য।
২. সবজি চাষ হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান
পতিত জমিকে উৎপাদনে আনার ক্ষেত্রে সবজি চাষ বিশেষ ভাবে উপযোগী। কারণ অনেক সবজি স্বল্প সময়ে উৎপাদন করা যায় এবং বাজারে এর চাহিদাও সারা বছর থাকে।
মৌসুম অনুযায়ী লাউ, কুমড়া, শসা, করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, ঢেঁড়স, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, মুলা, গাজর, পালংশাক, লালশাকসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করা যায়। অর্থাৎ একটি জমি সারা বছর খালি রাখার পরিবর্তে পরিকল্পিত ভাবে মৌসুমী সবজি উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব।
৩. ছোট জায়গা মানেই ছোট সম্ভাবনা নয় আমাদের অনেকের ধারণা, কৃষি করতে হলে বড় জমি প্রয়োজন। ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিতে অল্প জায়গায়ও অধিক উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। বাড়ির আঙিনা, পুকুরের পাড়, জমির আইল, রাস্তার পাশের উপযোগী জায়গা কিংবা ছোট পতিত জমিতে মাচা তৈরি করে লাউ, শসা, ঝিঙা, করলা ইত্যাদি চাষ করা যায়। নিচের জায়গায় আবার শাকজাতীয় ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। এ ভাবে একই জায়গার উল্লম্ব ও আনুভূমিক-দুই ধরনের ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
৪. উৎপাদনের আগে চাই পরিকল্পনা পতিত জমিতে চাষ শুরু করার আগে জমির প্রকৃতি বুঝতে হবে। জমিতে পানি জমে থাকে কি না, মাটির উর্বরতা কেমন, সেচের ব্যবস্থা আছে কি না এবং কোন মৌসুমে কোন ফসল ভালো হবে-এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। প্রয়োজনে মাটি পরীক্ষা করে ফসল নির্বাচন করা উচিত। জমি প্রস্তুতের সময় আগাছা পরিষ্কার, মাটি ঝুরঝুরে করা, জৈব সার প্রয়োগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উঁচু বেড তৈরি করতে হবে।
৫. মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হবে শুধু বেশি ফলন নয়, দীর্ঘমেয়াদে মাটির উৎপাদন ক্ষমতা ধরে রাখাও কৃষকের দায়িত্ব। তাই পতিত জমিতে সবজি চাষের সময় পচা গোবর, কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্টের মতো জৈব সার ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে মাটির প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম মাত্রায় অন্যান্য সার ব্যবহার করতে হবে। ‘বেশি সার মানেই বেশি ফলন’-এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক সার, সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে প্রয়োগ করতে হবে।
৬. নিরাপদ সবজি উৎপাদন এখন সময়ের দাবি সবজি উৎপাদনে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার শুধু উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় না, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার দিকে কৃষকদের এগিয়ে আসতে হবে। ক্ষেতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আক্রান্ত গাছ অপসারণ, ফেরোমন ফাঁদ, হলুদ স্টিকি ট্র্যাপসহ পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। একান্ত প্রয়োজন হলে কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত বালাইনাশক সঠিক মাত্রা ও অপেক্ষমাণ সময় মেনে ব্যবহার করা উচিত।
৭. একই জমিতে একাধিক ফসল পতিত জমিকে লাভজনক করার একটি কার্যকর কৌশল হলো ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো। একটি ফসল তোলার পর জমি ফেলে না রেখে দ্রুত পরবর্তী ফসলের চাষ করতে হবে। এ ছাড়া আন্তঃফসল ও মিশ্র চাষের মাধ্যমে একই জমি থেকে একাধিক ফসল পাওয়া সম্ভব। মাচায় একটি সবজি এবং নিচে অন্য একটি ফসল এ ধরনের পরিকল্পিত চাষ জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে।
৮. কৃষকের আয় বাড়াতে পারে পতিত জমি একজন কৃষকের কাছে জমি শুধু উৎপাদনের মাধ্যম নয়, এটি তাঁর সম্পদ। সেই সম্পদ যদি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকে, তাহলে সেখানে সম্ভাব্য আয়ও হারিয়ে যায়। পতিত জমিতে সবজি চাষ করে পারিবারিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত সবজি বাজারে বিক্রি করা সম্ভব। পারিবারিক শ্রম ব্যবহার করতে পারলে উৎপাদন খরচও অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
৯. তরুণদের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন কৃষি উদ্যোক্তা
পতিত জমিতে সবজি চাষকে শুধু পারিবারিক কৃষির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উদ্যোক্তা কার্যক্রমে রূপ দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে তরুণরা আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাত, ড্রিপ বা অন্যান্য সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থা, অনলাইন বিপণন এবং সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রির মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করতে পারে। কৃষির সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে পতিত জমিও হয়ে উঠতে পারে ‘স্মার্ট কৃষি’র ক্ষেত্র।
১০. বাজার বুঝে ফসল নির্বাচন কৃষকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাওয়া। তাই, শুধু ফলন বেশি হলেই হবে না, বাজারের চাহিদাও বিবেচনায় নিতে হবে। কোন মৌসুমে কোন সবজির চাহিদা বেশি, স্থানীয় বাজারে কোন ফসলের সরবরাহ কম এবং কোন ফসল দ্রুত নষ্ট হয়-এসব বিষয় বিবেচনা করে উৎপাদন পরিকল্পনা করতে হবে। সম্ভব হলে কৃষকরা দলবদ্ধ ভাবে উৎপাদন ও বাজারজাত করলে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়তে পারে।
১১. কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি পতিত জমি চাষের আওতায় আনতে কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফসল নির্বাচন, জাত, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া প্রয়োজন। জে/এ
ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ, কেন্দ্রীয় সভাপতি
বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন (BPF)
কৃষি লেখক, কথক-বাংলাদেশ বেতার।
