বুধবার ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৫শে ভাদ্র, ১৪৩৩

ক্রীড়া ভাষ্যকারদের স্মরণে দোয়া ও স্মরণ সভা

[print_bangla]

ড. রবি চতুর্বেদী-

বাংলাদেশের বাংলা ধারাভাষ্যের বন্ধু খেলা শুধু মাঠে জন্ম নেয় না-তার আর-একটি জন্ম হয় মানুষের কণ্ঠে। ব্যাটের আঘাতে বল যখন। ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সম্মেলন হলে আয়োজন করে ছিল এক স্মরণ ও দোয়া মাহফিল। এটি নিছক একটি অনুষ্ঠান ছিল না; ছিল বিস্মৃতির বিরুদ্ধে ভালোবাসার এক দীপ্ত কণ্ঠ থেমেছে খেলা শুধু মাঠে জন্ম নেয় না-তার আর-একটি জন্ম হয় মানুষের কণ্ঠে। ব্যাটের আঘাতে বল যখন আকাশ ছোঁয়া, গোলের মুহূর্তে যখন জনতার হৃদয় একসঙ্গে ধ্বনিত হয়, কিংবা শেষ বাঁশির সঙ্গে যখন একটি ম্যাচ ইতিহাসে পরিণত হয়, তখন সেই দৃশ্যকে কোটি মানুষের স্মৃতিতে অমর করে তোলেন ধারাভাষ্যকার। তাঁদের কণ্ঠে খেলা হয়ে ওঠে কবিতা, উত্তেজনা হয়ে ওঠে সুর, আর একটি সাধারণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে জাতির সম্মিলিত স্মৃতি। কালের স্রোতে সেই প্রিয় কণ্ঠগুলির অনেকেই আজ নীরব। মাইক্রোফোনে তাঁদের আর শোনা যায় না সেই পরিচিত ওঠা নামা, আবেগ, রসিকতা কিংবা নাটকীয় বর্ণনা। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, কণ্ঠ থেমে গেলেও স্মৃতি থামে না। তাঁদের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন বাংলাদেশের ক্রীড়া-আকাশে এখনও প্রতিধ্বনিত হয়। তাঁরা ছিলেন শুধু ধারাভাষ্যকার নন; তাঁরা ছিলেন সময়ের সাক্ষী, প্রজন্মের সহযাত্রী এবং একটি জাতির ক্রীড়া-ইতিহাসের মৌখিক ইতিহাসকার। এই অমর কণ্ঠগুলির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাংলাদেশ স্পোর্টস কমেন্টেটর্স অ্যাসোসিয়েশন (BSCA) ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সম্মেলন হলে আয়োজন করে ছিল এক স্মরণ ও দোয়া মাহফিল। এটি নিছক একটি অনুষ্ঠান ছিল না; ছিল বিস্মৃতির বিরুদ্ধে ভালোবাসার এক দীপ্ত উচ্চারণ-‘যাঁরা আমাদের আনন্দ দিয়ে ছিলেন, তাঁদের আমরা ভুলিনি।”
স্মরণ করা হয় বাংলা ক্রীড়া ধারাভাষ্যের পথিকৃৎ আবদুল হামিদ, আতাউল হক মল্লিক, বদরুল হুদা চৌধুরী, তৌফিক আজিজ খান, মোহাম্মদ শাহজাহান, খোদা বক্স মৃধা, মনজুর হাসান মিন্টু, নূর আহমেদ, মোহাম্মদ মুসা, এস. কে. মাহবুব, হান্নান খান এবং প্রয়াত সকল ক্রীড়া ধারাভাষ্যকারকে। তাঁদের প্রত্যেকের কণ্ঠ ছিল স্বতন্ত্র, অথচ তাঁদের সাধনা মিলেমিশে নির্মাণ করেছে বাংলা ক্রীড়া ধারাভাষ্যের এক গৌরবময় উত্তরাধিকার। আবদুল হামিদকে স্মরণ করা হয় বাংলা ধারাভাষ্যের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে। আতাউল হক মালিক ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী-ধারাভাষ্যকারের পাশাপাশি ফুটবল রেফারি ও ক্রীড়া-লেখক হিসেবেও তিনি রেখে গেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর। আর খোদা বক্স মৃধার কণ্ঠে যেন সাহিত্য এসে আশ্রয় নিয়ে ছিল। শব্দের সৌন্দর্য, কণ্ঠের ওঠানামা এবং ভাষার মাধুর্যে তিনি ধারাভাষ্যকে দিয়ে ছিলেন এক অনন্য শিল্পরূপ।


বদরুল হুদা চৌধুরী, মোহাম্মদ মুসা, মনজুর হাসান মিন্টু এবং অন্য কিংবদন্তিদের স্মৃতিচারণে অনুষ্ঠানের পরিবেশ হয়ে ওঠে আবেগঘন। তাঁদের পরিবার ও উত্তরসূরিদের কণ্ঠে ফিরে আসে হারানো দিনের মানুষগুলি। আতাউল হক মল্লিকের পুত্র জাহিদুল হক মল্লিক স্মরণ করেন-ধারাভাষ্যের দীর্ঘ দায়িত্ব শেষে ঘরে ফিরেও তাঁর বাবা সন্তানদের পড়াশোনা ও ভালো-মন্দের খোঁজ নিতে ভুলতেন না। প্রিয়জনের স্মৃতিতে এমন ছোট ছোট মুহূর্তই মানুষকে কিংবদন্তির আসন থেকে নামিয়ে আমাদের হৃদয়ের আরও কাছে এনে দেয়। প্রয়াত মনজুর হাসান মিন্টুর সহধর্মিণী পারভিন হাসান এবং মোহাম্মদ মুসার ছোট বোন সুরাইয়া বেগমও স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তাঁদের আপনজনদের কথা বলেন। তাঁদের কথায় ছিল হারানোর বেদনা, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল গর্ব-কারণ তাঁদের প্রিয়জনেরা তাঁদের জীবনকে উৎসর্গ করে ছিলেন ক্রীড়া ও মানুষের আনন্দের জেনা। এই কারণেই BSCA-এর এই স্মরণ সভা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সংগঠনটি শুধু অতীতকে স্মরণ করেনি ভবিষ্যতের ধারাভাষ্য জগতের জন্যও একটি পথরেখা বাঁকাছেন। তরুণ ধারাভাষ্যকারদের দক্ষতা তার চেয়েও বড় ছিল গর্ব-কারণ তাঁদের প্রিয়জনেরা তাঁদের জীবনকে উৎসর্গ করে ছিলেন ক্রীড়া ও মানুষের আনন্দের জন্য।
BSCA-এর সভাপতি ড. অনুপম হোসেনের নেতৃত্বে এই আয়োজন প্রমাণ করল, একটি ক্রীড়া-ধারাভাষ্য পরিবার তার পূর্বসূরিদের প্রতি কতটা ঋণী। প্রধান উপদেষ্টা ও জীবন্ত কিংবদন্তি আলফাজ উদ্দিন আহমেদ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার শামীম আশরাফ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মো. সামসুল ইসলাম, ক্রীড়া সাংবাদিক, সংগঠক, প্রবীণ ও নবীন ধারাভাষ্যকার এবং প্রয়াতদের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে পরিণত করে এক প্রজন্ম থেকে আর-এক প্রজন্মের হাতে ঐতিহ্য হস্তান্তরের আয়োজনে। কারণ ধারাভাষ্যকার কখনও কেবল একটি ম্যাচের বর্ণনাকারী নন। তিনি সময়কে শব্দে বন্দি করেন। যে মানুষটি রেডিওর পাশে বসে তাঁর কণ্ঠ শুনে ছিলেন, কিংবা টেলিভিশনের সামনে বসে তাঁর উচ্চারণে উত্তেজিত হয়ে ছিলেন, বহু বছর পরও সেই কণ্ঠের সঙ্গে নিজের যৌবন, স্বপ্ন, আনন্দ ও দেশের বিজয়ের স্মৃতি খুঁজে পান। তাই একটি কণ্ঠের মৃত্যু আসলে একটি যুগের নীরবতা।
এই কারণেই BSCA-এর এই স্মরণ সভা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সংগঠনটি শুধু অতীতকে স্মরণ করেনি; ভবিষ্যতের ধারাভাষ্য জগতের জন্যও একটি পথরেখা এঁকেছে। তরুণ ধারাভাষ্যকারদের দক্ষতা উন্নয়নে কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ আয়োজনের প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্টেডিয়ামের ধারাভাষ্য কক্ষ প্রয়াত বিশিষ্ট ধারাভাষ্যকারদের নামে নামকরণের প্রস্তাবও উঠেছে। এটি শুধু নামফলক স্থাপন নয়-এ এক জাতির কৃতজ্ঞতার স্থায়ী স্বাক্ষর।
অনুষ্ঠানে ড. রবি চতুর্বেদীর শুভেচ্ছা বার্তাও পাঠ করা হয়-যিনি হিন্দি ক্রীড়া ধারাভাষ্যের একজন পথিকৃৎ। তাঁর বার্তা যেন ভারত ও বাংলাদেশের ক্রীড়া-ধারাভাষ্য fraternity-র মধ্যে এক আবেগের সেতু নির্মাণ করে। শেষে যখন প্রয়াতদের আত্মার শান্তি ও পরম করুণাময়ের ক্ষমা প্রার্থনা করে দোয়া অনুষ্ঠিত হলো, তখন মনে হলো-মাইক্রোফোন নীরব হতে পারে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসার কোনো মাইক্রোফোন নেই; তার প্রতিধ্বনি অনন্ত। বাংলা ক্রীড়া ধারাভাষ্যের এই অগ্রদূতেরা আজ নেই, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠ বাংলাদেশের ক্রীড়া-ইতিহাসের পাতায় এখনও জীবন্ত। তাঁদের স্মরণ করা মানে শুধু অতীতকে প্রণাম করা নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানো-কোন কণ্ঠে একদিন একটি জাতি তার খেলার স্বপ্ন শুনে ছিল। আল্লাহ পরম করুণাময় তাঁদের সকলের আত্মাকে শান্তি দিন, তাঁদের সৎকর্ম কবুল করুন এবং তাঁর অসীম রহমতের চিরন্তন ছায়ায় তাঁদের স্থান দিন। তাঁদের কণ্ঠ থেমেছে-কিন্তু তাঁদের উত্তরাধিকার কখনও থামবে না। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ক্রীড়া ভাষ্যকারদের স্মরণে দোয়া ও স্মরণ সভা

০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top