
মাকসুদুল হক, ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি:
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের চাঞ্চল্যকর কিশোরী নিঝুম খাতুন (১৭) নিখোঁজের দীর্ঘ ১৮ মাস পর লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে জেলা সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল। এই নৃশংস ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নিঝুমের প্রেমিক মাশরিকুল রহমান জিমকে (২৩) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামি জিম আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেছে। পুলিশ ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ প্রেমের সম্পর্কের জেরে ফতেপুর গ্রামের কিশোরী নিঝুম খাতুনকে বেড়ানোর কথা বলে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানাধীন পাকশী রেল স্টেশনে নিয়ে যায় রাখালভোগা গ্রামের কামাল হোসেনের ছেলে মাশরিকুল রহমান জিম। সেখানে ঘোরাঘুরির একপর্যায়ে জনশূন্য পাকশী রেল লাইনের প্ল্যাটফর্মে বসে নিঝুম আসামি জিমকে বিয়ে করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে তীব্র কথা-কাটাকাটির জেরে জিম নিঝুমকে সজোরে থাপ্পড় মারলে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। এরপর জিম তাকে টেনেহিঁচড়ে রেললাইনের নিচে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যায় এবং নিঝুমের নিজের পরনের ওড়না দিয়ে গলা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা নিশ্চিত করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে জঙ্গলের পাশে ফেলে রেখে জিম ট্রেনযোগে পালিয়ে যায়।
হত্যাকাণ্ডের চার দিন পর, অর্থাৎ গত ২০২৫ সালের ১৭ই মার্চ দুপুরে ঈশ্বরদী থানা পুলিশ অজ্ঞাতনামা হিসেবে নিঝুমের মরদেহ উদ্ধার করে। ওই সময় পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় ঈশ্বরদী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু হয় এবং ময়নাতদন্ত শেষে পাবনা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সহায়তায় লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে কবরস্থ করা হয়।
এদিকে নিঝুমের কোনো সন্ধান না পেয়ে তার মা মোছাঃ তাসলিমা খাতুন বাদী হয়ে মহেশপুর থানায় প্রথমে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরবর্তীতে ভিকটিম উদ্ধার না হওয়ায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ ১৮ মাস অতিবাহিত হলেও কিশোরী নিঝুমের সন্ধান না মেলায় অবশেষে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে নামে ঝিনাইদহ জেলা সাইবার ইনভেস্টিগেশন সেলের চৌকস টিম। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তদন্তকারী দল মহেশপুরের রাখালভোগা গ্রাম থেকে জিমকে হেফাজতে নেয়। পরে তাকে রিমান্ডে এনে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে নিঝুম খাতুনকে হত্যার কথা স্বীকার করে।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম আসামি জিমকে সাথে নিয়ে ঈশ্বরদী থানার পাকশী রেল স্টেশন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনাস্থল শনাক্ত করে। পরবর্তীতে সিআইডি ক্রাইম সিনের আর্কাইভে সংরক্ষিত অজ্ঞাত মরদেহের ছবি ও পোশাকের নমুনা দেখে জিম ও তদন্তকারী দল নিশ্চিত হয় যে, ১৮ মাস আগে উদ্ধার হওয়া ওই অজ্ঞাতনামা মরদেহটিই ছিল নিখোঁজ নিঝুম খাতুনের।
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান জানান, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় দেড় বছর পর এই ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ডের জট খোলা সম্ভব হয়েছে। গত মঙ্গলবার ঝিনাইদহের বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে আসামি জিম কিশোরী নিঝুম হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে, যার প্রেক্ষিতে আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। জে/এ
