
আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
বাংলাদেশের সামুদ্রিক খাতে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখনো এ খাতের সম্ভাবনার শতভাগ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিতে বিশ্ব নৌ-দিবস ও প্রতিষ্ঠানটির ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
নৌমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ জলভাগ। বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের বড় একটি অংশ সমুদ্রকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেরও সামুদ্রিক খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষতা, সাহস ও বিশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশে মেরিন একাডেমি, নৌ-পরিবহন অধিদফতর, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসিসহ প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত অর্জন নিশ্চিত হয়নি। কেন কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না, তা নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘যত সম্ভাবনা থাকার পরও আমাদের দেশে এই খাতটি সম্ভাবনার শতভাগে বিকশিত হয়েছে বলে আমি মনে করি না। যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল, আমরা সেটা কাজে লাগাতে পারিনি। তবে পারিনি বলে পারব না—এভাবে আর ভাবছি না। আমরা এগিয়ে যেতে চাই।’
সামুদ্রিক খাতের বিভিন্ন অসংগতির বিষয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব সমস্যা দ্রুত দূর করতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, জাহাজ পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর ও চীনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। দেশের সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বন্দর ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষতা প্রয়োজন। কনটেইনার পরিচালনা ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে সেবার মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য বন্দরকেও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।
মেরিন ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ শেষে জাহাজে ওঠার সুযোগের সীমাবদ্ধতার বিষয়েও কথা বলেন নৌমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশি মেরিনারদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়েও কাজ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, সামুদ্রিক বাণিজ্য ও বিশ্ব অর্থনীতির বড় একটি অংশ দক্ষ মেরিনারদের ওপর নির্ভরশীল। তাই মেরিটাইম খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি দক্ষ ক্যাডেট তৈরি করে আসছে। দেশ-বিদেশের মেরিটাইম খাতে একাডেমির প্রশিক্ষিত জনবল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। চট্টগ্রামের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিকে সমুদ্র ও বন্দরভিত্তিক অর্থনীতির একটি শক্তিশালী মেরিটাইম হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাই এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এবিএম শামীম স্বাগত বক্তব্যে বলেন, নীতি থেকে বাস্তবায়ন এবং সম্ভাবনা থেকে উৎকর্ষের পথে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। এ জন্য দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপদ নৌ-চলাচল, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মহাপরিচালক কমান্ডার মো. শফিউল বারী, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, মেরিটাইম খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তি, প্রশিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ক্যাডেট ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ব নৌ-দিবস উপলক্ষে ক্যাডেটদের অংশগ্রহণে প্রধান অতিথিকে গার্ড অব অনার প্রদান, প্যারেড পরিদর্শন, র্যালি, বেলুন উড্ডয়ন, বৃক্ষরোপণ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
এবারের বিশ্ব নৌ-দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—‘নীতি থেকে বাস্তবায়ন : সামুদ্রিক উৎকর্ষের পথে অগ্রযাত্রা’। প্রতিপাদ্যের আলোকে সামুদ্রিক নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ, দক্ষ ও টেকসই সামুদ্রিক খাত গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি দীর্ঘ ৬৪ বছর ধরে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সামুদ্রিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে আসছে। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় জুলদিয়ায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষিত পাঁচ হাজারের বেশি মেরিনার বর্তমানে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ও বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি ১২৫ জনের বেশি নারী মেরিনার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে দায়িত্ব পালন করছেন।