রানা থেকে ফেরদৌস হাসান,’চার দশকের বন্ধুত্বে দেখা এক সৃষ্টিশীল মানুষের গল্প,

[print_bangla]

 

আকবর হায়দার কিরন

কিছু মানুষকে সময়ের সঙ্গে শুধু নতুন নামে চেনা যায়।
কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের একটি নাম থাকে পৃথিবীর কাছে, আর আরেকটি নাম থাকে বন্ধুদের হৃদয়ে।

বাংলাদেশের সাহিত্য, টেলিভিশন ও নাট্যজগতের পরিচিত মুখ ফেরদৌস হাসান—আমার কাছে আজও সেই পুরোনো রানা।

চার দশকেরও বেশি সময়ের বন্ধুত্ব আমাদের। এই দীর্ঘ সময়ে কত কিছু বদলে গেছে—শহর বদলেছে, জীবন বদলেছে, পেশা বদলেছে, পরিচিত মানুষের অনেকেই হারিয়ে গেছেন। কিন্তু কিছু বন্ধুত্ব সময়ের কাছে পরাজিত হয় না। দূরত্ব তাদের দুর্বল করে না; বরং পুরোনো স্মৃতিগুলোকে আরও গভীর করে।

ফেরদৌস হাসানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব তেমনই একটি সম্পর্ক।

আজ তিনি বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক, নাট্যকার ও নির্মাতা। অসংখ্য টেলিভিশন নাটকের গল্পকার ও পরিচালক। চলচ্চিত্রের গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনায়ও তাঁর দীর্ঘ অবদান রয়েছে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে তাঁর পরিচয় শুরু হয়েছিল অনেক আগেই—যখন তিনি ছিলেন আমাদের প্রিয় রানা।

আখতার ফেরদৌস রানা

ফেরদৌস হাসানের সৃষ্টিশীল জীবনের শুরুর দিকে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত ছিল আখতার ফেরদৌস রানা। সাহিত্য ও নাট্যচর্চার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তিনি নিজের একটি আলাদা জগৎ তৈরি করেন।

১৯৮১ সালে ঝিনুক নীরবে সহো নাটকের মাধ্যমে তাঁর টেলিভিশন নাট্যকার হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। এরপর একের পর এক নাটক তাঁকে দর্শকের কাছে পরিচিত করে তোলে। ঝুমকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; নাটকটি বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেরা নাটকের স্বীকৃতিও পেয়েছিল।

এরপর তাঁর সৃষ্টির পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে।

নাটক লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন, উপন্যাস লিখেছেন, চলচ্চিত্রের গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছেন, গান লিখেছেন, সুরও করেছেন। তাঁর কর্মজীবনের ব্যাপ্তি বোঝাতে গিয়ে The Daily Star তাঁকে “The man of a thousand scripts” হিসেবে উল্লেখ করেছে; সেখানে তাঁর এক হাজারের বেশি নাটকের স্ক্রিপ্ট এবং প্রায় ৪০টি চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লেখার কথা বলা হয়েছে।

সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর।

কিন্তু আমার কাছে সংখ্যার চেয়েও বড় বিষয় হলো—এই মানুষটি কখনো গল্প বলা থামাননি।

গল্পের ভেতর মানুষ

ফেরদৌস হাসানের লেখার জগৎ মূলত মানুষকে ঘিরে।

সম্পর্ক, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, পারিবারিক টানাপোড়েন, সামাজিক বাস্তবতা—জীবনের নানা পরিচিত অনুভূতি তাঁর গল্পের উপাদান হয়ে এসেছে। টেলিভিশনের জনপ্রিয়তার ভেতর থেকেও তিনি মানুষের জীবন ও সমাজের নানা দিককে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর নাটক ও লেখালেখির দীর্ঘ তালিকা আজ বাংলাদেশের টেলিভিশন ও সাহিত্য-সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য সময়ের সাক্ষ্য বহন করে।

কিন্তু একজন লেখককে তাঁর সৃষ্টির তালিকা দিয়ে যতটা চেনা যায়, একজন বন্ধুকে ততটা চেনা যায় না।

বন্ধুকে চেনা যায় তার চোখে।

তার নীরবতায়।

তার পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতায়।

সেই কারণেই আমার কাছে ফেরদৌস হাসানের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি কোনো নাটকের সেটে নয়—নিউ ইয়র্কের JFK বিমানবন্দরে।

আফ্রিকা থেকে নিউ ইয়র্ক

১৯৯৫ সাল।

রানা তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন মেজর হিসেবে আফ্রিকায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই দূর আফ্রিকা থেকে তিনি নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন আমার Woodside-এর বাড়িতে।

বন্ধুকে বিমানবন্দরে নিতে গিয়েছিলাম।

JFK-তে দেখা হওয়ার মুহূর্তটি আজও আমার চোখে ভাসে।

আমাকে দেখে রানা বিস্মিত হয়েছিলেন।

আমার মুখে তখন সেই পরিচিত প্রাণবন্ততা ছিল না। চেহারায় ক্লান্তি, চোখে বিষণ্ণতা। একজন পুরোনো বন্ধু হয়তো প্রথম দেখাতেই অনেক কিছু পড়ে নিতে পারে। রানা-ও পেরেছিলেন।

বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার পর ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারলেন, শুধু আমার জীবন নয়—আমার এবং কবিতার জীবনের আকাশেও তখন যেন এক গভীর অন্ধকার নেমে এসেছে।

রানা আমাদের দুজনেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।

তাই আমাদের বর্তমান অবস্থার কথা জেনে তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন।

বন্ধুর জন্য কিছু অসহায় প্রার্থনা

রানা যে কদিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন, নিজের মতো করে চেষ্টা করেছিলেন আমাদের মন ভালো করার।

কথা বলেছেন। পাশে থেকেছেন। আমাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। জীবনের সেই কঠিন সময়টিকে একটু সহজ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু কিছু কিছু দুঃখের সামনে মানুষ সত্যিই অসহায়।

বন্ধু যতই প্রিয় হোক, সব অন্ধকার সে সরিয়ে দিতে পারে না।

রানা হয়তো সেটাই অনুভব করেছিলেন।

নামাজের সময় তাঁর চোখ ভিজে উঠত।

তিনি আমাদের জন্য দোয়া করতেন।

সেই দৃশ্যটি আমার স্মৃতিতে আজও অমলিন—একজন বন্ধু, দূর আফ্রিকার শান্তিরক্ষা মিশন থেকে আসা একজন সেনা কর্মকর্তা, নিজের প্রার্থনায় দুই বন্ধুর জীবনের অন্ধকার কাটার জন্য হয়তো আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইছেন।

কিন্তু সব প্রার্থনার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে আসে না।

কখনো কখনো সময়কে তার নিজের পথেই চলতে হয়।

সমুদ্রের ধারে তিন বন্ধু

সেই কঠিন সময়ের মধ্যেও জীবনের কিছু সুন্দর মুহূর্ত আমাদের জন্য রেখে গিয়েছিল নিউ ইয়র্ক।

আমরা তিনজন একসঙ্গে সমুদ্রের ধারে সময় কাটিয়েছিলাম।

সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে মানুষের নিজের দুঃখগুলো কখনো খুব ছোট মনে হয়, আবার কখনো আরও গভীর হয়ে ওঠে।

দিগন্তজোড়া জলরাশি, আকাশ, বাতাস আর আমাদের তিনজনের কথোপকথন—আজ এত বছর পরও সেই দিনটি মনে পড়ে।

কী কথা হয়েছিল সব হয়তো আর মনে নেই।

কিন্তু অনুভূতিটা মনে আছে।

বন্ধুত্বের অনুভূতি।

একসঙ্গে থাকার অনুভূতি।

আর জীবনের এক কঠিন সময়েও কিছু মানুষ যে পাশে থাকে—তার উষ্ণতা।

সমুদ্রের ঢেউ সেদিন চলে গিয়েছিল।

কিন্তু স্মৃতিটা থেকে গেছে।

“কিরন, তুমি নিজের মতো করে ভালো থেকো”

বিদায়ের সময় এসে গেল।

রানা আবার তাঁর কর্মস্থলে ফিরে যাবেন।

জীবন আবার আমাদের দুজনকে দুই ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে।

বিদায়ের আগে তিনি আমাকে বলেছিলেন—

“কিরন, তুমি নিজের মতো করে ভালো থেকো।”

মাত্র কয়েকটি শব্দ।

কিন্তু চার দশকেরও বেশি সময় পরে সেই কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে।

কত অদ্ভুত—জীবনে বড় বড় বক্তৃতা, অসংখ্য কথা, কত মানুষের কত উপদেশ আমরা শুনি; কিন্তু কিছু ছোট বাক্য হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে যায়।

সেদিন রানার সেই কথাটিও তেমনই একটি বাক্য হয়ে রয়ে গেছে।

তার মধ্যে ছিল বন্ধুত্ব।

ছিল মমতা।

ছিল উদ্বেগ।

আর ছিল এক ধরনের অসহায় ভালোবাসা—যে ভালোবাসা বন্ধুর কষ্ট নিজের হাতে সরিয়ে দিতে না পারলেও অন্তত তার জন্য প্রার্থনা করতে জানে।

আজকের ফেরদৌস হাসান

আজ যখন আমি ফেরদৌস হাসানের দিকে ফিরে তাকাই, তখন শুধু সেই ১৯৯৫ সালের রানাকে দেখি না।

দেখি একজন দীর্ঘপথের সৃষ্টিশীল মানুষকে।

একজন লেখক, যিনি গল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

একজন নাট্যকার, যিনি বাংলাদেশের টেলিভিশনের একটি দীর্ঘ সময়ের সঙ্গে যুক্ত।

একজন নির্মাতা, যিনি ক্যামেরার সামনে ও পেছনে নিজের সৃষ্টিশীল পরিচয় তৈরি করেছেন।

একজন চলচ্চিত্রের গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার, যাঁর কাজের পরিধি টেলিভিশনের বাইরেও বিস্তৃত।

আর সর্বোপরি—একজন মানুষ, যিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আমার জীবনের স্মৃতিতে একটি বিশেষ জায়গা ধরে আছেন।

খ্যাতি মানুষকে অনেকের কাছে পরিচিত করে।

কিন্তু বন্ধুত্ব একজন মানুষকে অন্যভাবে চিনতে শেখায়।

আমি ফেরদৌস হাসানের সাফল্য দেখেছি।

কিন্তু তাঁর অসহায় চোখও দেখেছি।

আমি তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিস্তার দেখেছি।

কিন্তু বন্ধুর জন্য নামাজে চোখ ভিজতেও দেখেছি।

আমি তাঁর জনপ্রিয়তা দেখেছি।

কিন্তু JFK-তে একজন বন্ধুর মলিন মুখ দেখে তাঁর উদ্বেগও দেখেছি।

এই দুই ফেরদৌস হাসান—একজন জনসম্মুখের, অন্যজন ব্যক্তিগত—আমার কাছে একই মানুষ।

রানা রয়ে যায় রানা

সময়ের কাছে পরিচয় বদলে যায়।

আখতার ফেরদৌস রানা হয়ে ওঠেন ফেরদৌস হাসান।

একজন তরুণ স্রষ্টা হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত লেখক, নাট্যকার ও নির্মাতা।

কিন্তু বন্ধুত্বের অভিধানে কিছু নাম কখনো বদলায় না।

আমার কাছে তিনি আজও—

রানা।

১৯৯৫ সালের সেই JFK বিমানবন্দর।

Woodside-এর সেই বাড়ি।

দুই বন্ধুর জীবনের অন্ধকার আকাশ।

নামাজে ভিজে ওঠা তাঁর চোখ।

সমুদ্রের ধারে আমাদের তিনজনের সেই সময়।

আর বিদায়ের আগে বলা সেই অমর বাক্য—

“কিরন, তুমি নিজের মতো করে ভালো থেকো।”

জীবন অনেক দূর চলে গেছে।

আমরাও বয়সে, অভিজ্ঞতায়, সময়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি।

কিন্তু কিছু স্মৃতি বয়স মানে না।

কিছু বন্ধুত্ব দূরত্ব মানে না।

আর কিছু মানুষ—তাঁরা যত বড়ই হয়ে উঠুন, যত পরিচিতই হয়ে উঠুন—পুরোনো বন্ধুর হৃদয়ে তাঁরা একই রয়ে যান।

রানা রয়ে যায় রানা।

হয়তো এটাই চার দশকের বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর সত্য।

একজন মানুষ হাজার গল্প লিখতে পারেন।

কিন্তু বন্ধুত্বের কিছু গল্প কোনোদিন লেখা হয় না।

তারা শুধু বেঁচে থাকে—

একটি মলিন মুখে,
এক জোড়া ভেজা চোখে,
সমুদ্রের ধারে কাটানো একটি বিকেলে,
আর বিদায়ের আগে উচ্চারিত কয়েকটি শব্দে।

*এম আব্দুর রাজ্জাক *

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রানা থেকে ফেরদৌস হাসান,'চার দশকের বন্ধুত্বে দেখা এক সৃষ্টিশীল মানুষের গল্প,

০৮ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top