এক দরদী বিপ্লবীর চিরবিদায়: নানা পাটেকর

[print_bangla]

 

আকবর হায়দার কিরন

রূপালী পর্দার আলোকোজ্জ্বল জগতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আসেন, যাঁরা অভিনয়কে কেবল অনুকরণে সীমাবদ্ধ রাখেন না—তাকে রূপান্তরিত করেন জীবনের সবচেয়ে নিখাঁদ ও ব্যথাতুর সত্যে। নানা পাটেকর ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনের তেমনই এক ক্ষণজন্মা, কালজয়ী ও অপ্রতিরোধ্য নাম। তাঁর তীক্ষ্ণ চোখের ভাষা, অপ্রচলিত সংলাপ শৈলী এবং অভিনয় ক্যানভাসে আবেগের ঝড় তোলার যে দুর্লভ ক্ষমতা ছিল, তা কোটি কোটি সিনেমা অনুরাগী ও সাধারণ দর্শককে যুগের পর যুগ মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে। তিনি পর্দায় আসা মানেই ছিল অনুভূতির এক অনন্য মহাসমুদ্র—যেখানে মিশে থাকত ক্ষোভ, ভালোবাসা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং চরম বাস্তবতা।

নানা পাটেকরের অভিনয় যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন তিনি পর্দায় চরিত্র হিসেবে অভিনয় করতেন না; চরিত্রটিই হয়ে উঠতেন। তাঁর একের পর এক অনবদ্য সৃষ্টি দর্শকদের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে গেছে। ‘পরিন্দা’, ‘অগ্নিসাক্ষী’ কিংবা ‘ক্রান্তিবীর’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর তীব্র বাচনভঙ্গি এবং ক্ষোভের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, তা আজও রূপালী পর্দার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। ‘ক্রান্তিবীর’-এর শেষ দৃশ্যে তাঁর সেই ঐতিহাসিক সংলাপ কেবল একটি সিনেমার দৃশ্য ছিল না; তা ছিল সমাজ ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ—যা শোনামাত্র দর্শকের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত।

তবে নানা পাটেকরের আসল যাদু কেবল চড়া সুর বা তীব্র ক্ষোভের প্রকাশেই থমকে থাকেনি। তিনি ছিলেন দরদী আবেগের এক অপরূপ রূপকার। অভিনয় দেখতে গিয়ে দর্শকের চোখের কোণ ভিজে ওঠার যে অভিজ্ঞতা, তা তাঁর বহু কাজের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ চলচ্চিত্রে এক মূক ও বধির বাবার চরিত্রে তাঁর সংলাপহীন ব্যাকুলতা এবং সন্তানের প্রতি নিঃশব্দ ভালোবাসার প্রকাশ কার না চোখ অশ্রুসজল করেছিল? কোনো শব্দ না বলেও শুধু চোখের দৃষ্টি আর নীরব দীর্ঘশ্বাসে হৃদয়ের গভীরতম যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলার যে ক্ষমতা তাঁর ছিল, তা এক কথায় অতুলনীয়।

মারাঠি ভাষার অমর চলচ্চিত্র ‘নটসম্রাট’-এ একজন অবসরপ্রাপ্ত থিয়েটার শিল্পীর ট্র্যাজেডি ও মানসিক টানাপোড়েন ফুটিয়ে তোলার সময় তাঁর কান্না, অভিমান আর আত্মসম্মানের লড়াই রূপালী পর্দার সীমানা ছাড়িয়ে দর্শকের বুক চেপে ধরা যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছিল। একইভাবে ‘ডক্টর প্রকাশ বাবা আমটে’-তে সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার যে প্রতিচ্ছবি তিনি এঁকেছিলেন, তা মানুষের মনে এক অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করে। পর্দায় তাঁর অশ্রু কখনো মেকি মনে হয়নি; তা ছিল জীবনের সবচেয়ে জীবন্ত ও বাস্তব অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ।

পর্দার বাইরের জীবনটিতেও তিনি ছিলেন এক অনন্য, মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষ। মুম্বাইয়ের চাকচিক্যময় জগৎ থেকে দূরে গিয়ে মহারাষ্ট্রের খরা পীড়িত কৃষক সম্প্রদায়ের জন্য তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা তাঁকে ভারতীয় শিল্পের জগতে এক বিরল মানবতাবাদী মর্যাদা দিয়েছে। ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে নিঃস্বার্থভাবে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো কিংবা সামাজিক অসমতার বিরুদ্ধে সরব হওয়া প্রমাণ করে—পর্দায় যে দরদী ও প্রতিবাদী মানুষটিকে দেখা যেত, বাস্তবেও তাঁর হৃদয়ে স্পন্দিত হতো ঠিক একই অনুভূতির ধারা।

দুঃখের বিষয়, বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক কখনো নানা পাটেকরের অভিনয় সরাসরি উপভোগ করার সৌভাগ্য অর্জন করেননি। ‘আইপিএস বকুল’ কিংবা ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’-এর মতো একাধিক ছবিতে তাঁকে নেওয়ার উদ্যোগ হলেও আর্থিক ও অন্যান্য কারণে তা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। বাংলা পর্দার এই অপূর্ণতা হয়তো ইতিহাসের এক নীরব আফসোস হয়েই থেকে গেল।

একটি নক্ষত্রের অবসান কেবল শিল্প জগতের শূন্যতা নয়; তা সেই সমস্ত অনুরাগী ও দর্শকের জন্য এক গভীর ব্যক্তিগত ক্ষতি, যাঁদের তিনি হাসিয়েছেন, ভাবিয়েছেন এবং বারবার চোখের জলে ভাসিয়েছেন। যে শিল্পী রূপালী পর্দায় আমাদের অসংখ্যবার কাঁদিয়েছেন, তাঁর চিরবিদায় আমাদের চোখে রেখে গেল চিরন্তন অশ্রু আর এক অনন্য নস্টালজিয়া। শিল্পের ক্যানভাসে, রূপালী পর্দার সংলাপে এবং অসংখ্য আবেগময় মুহূর্তের স্মৃতিতে নানা পাটেকর বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

* এম আব্দুর রাজ্জাক *

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক দরদী বিপ্লবীর চিরবিদায়: নানা পাটেকর

০৯ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top