
এম আব্দুর রাজ্জাক, স্টাফ রিপোর্টার –
তুলশীগঙ্গা নদীর পশ্চিম পার্শ্বে প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষপূর্ণ এলাকার নাম পাথরঘাটা । এটাই জয়পুরহাট একমাত্র স্থান যেখানে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, শশ্মান সব এক সাথে অবস্থিত । এখানেই অবস্থিত হযরত মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন শাহ্ (রাঃ) মাজার আরেক নাম নিমাই পীরের মাজার ।
হিন্দুদের কাছে এটা নিমাই সন্নাসী মাজার আর মুসলমানদের কাছে এটা নিমাই শাহ্ -এর মাজার।
জনশ্রুতিতে আছে মহীপাল ছিল একজন অত্যাচারী রাজা । তার রাজত্বের শেষ দিকে হযরত মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন শাহ্ (রাঃ) এখানে এসে আস্তানা গারেন । তার আধ্যাতিক ক্ষমতা ও সুব্যবহারে এলাকার মানুষ মুগ্ধ হয়ে এখানে দলে দলে আসতে থাকে । রাজার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও তা থেকে পরিত্রানের বিষয়ে হিন্দু, মুসলিম উভয় ধর্মের মানুষ নাসির উদ্দিন শাহ্ (রাঃ) শরণার্পন্ন হয় ।
তিনি তার আধ্যাতিক ক্ষমতা ও এলাকার মানুষকে একত্র করে রাজার এই অত্যাচারের প্রতিবাদ করেন । এতে অবশ্য কাজ হয় । তাই তিনি হিন্দু, মুসলিম সকল ধর্মের কাছে সন্মানীয় ।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ব গবেষক শাহরিয়ার কবির জানান,
মিনহাজ-ই-সিরাজের “তবকাৎ-ই-নাসিরী” বইতে বলা হয়েছে, ইখতিয়ার উদ্দিন বিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি দেবকোট (বর্তমান দিনাজপুর) থেকে কামরূপ হয়ে তিব্বত অভিযানে যাওয়ার সময় একটি পাথরের সেতুর উপর দিয়ে নদী পার হয়েছিলেন। এরপর সম্ভবত ঘোড়াঘাট হয়ে পরিশেষে ঘোড়ামারা নামক স্থানে সুবিশাল করতোয়া নদীর তীরে উপস্থিত হন।
বখতিয়ার খলজি করতোয়া পার হতে পারেন নি, করতোয়ায় তাঁর অনেক সৈন্য ডুবে মারা যায় এবং বাকী সৈন্য কামরূপ রাজার আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে যায়। তুলসীগঙ্গা নদীর উপর পাথরঘাটার সেতুটি সেই সেতু হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বখতিয়ার খলজি এ সেতুটি অতিক্রম করে পাথরঘাটার ওপারে “পীরপাল” গ্রামে বিশ্রাম নেন। বখতিয়ারের স্মৃতিতে গ্রামটির নাম পীরপাল। এ অঞ্চলে পীরপাল নামের অনেকগুলো জায়গা আছে, যেগুলো সবই বখতিয়ারের সাথে সম্পর্কিত, এমনকি বখতিয়ারের কবর যেখানে, সে জায়গাটিও পীরপাল নামযুক্ত। সে হিসেবে পাথরঘাটার ঐতিহাসিক মূল্য আরো অনেক বেশি।
এই নিমাই পীর বখতিয়ারের সেনাদলের কেউ হলেও হতে পারেন, যিনি যুদ্ধ অভিযানে নিহত হয়ে এখানে সমাহিত হয়েছেন এবং পরবর্তীতে পীরে উন্নীত হয়েছেন। পাথরঘাটা ও নিমাই পীর নিয়ে আরো গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
আরও জানা যায়, এই পাথরঘাটা থেকে কিছু দক্ষিণ পশ্চিম কোণে মহীপুর এলাকা।যা পাল সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এবং এই অংশে পাল রাজা মহীপাল এর রাজত্ব ছিল।
পাথরঘাটায় ছিল বিশাল আকৃতির পাথরের ব্রিজ। পাথরঘাটা ছিল তুলশীগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত । জনশ্রুতি আছে তুলশী ও গঙ্গা ছিলেন বোন। দুই বোনের নামেই নদীর নাম তুলশীগঙ্গা । এই নদীর তীরে অর্থাৎ পাথরঘাটা নিমাই পীরের সমাধি থেকে সোজা উত্তরে ব্রিজ সংলগ্ন কালী মন্দির ও শশ্মানে নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয় মালো সম্প্রদায়ের লোকজন জানান, এই শশ্মান সুপ্রাচীন কাল থেকে এখানে ছিল, সেটাই পুণ: নির্মাণ করা হয়েছে । এর কোন এক পাশেই ছিল সতীদেবীর ঘাট। এই সতীদেবী রাজা মহিপালের কন্যা ছিলেন।