বুধবার ২৯শে জুলাই, ২০২৬ ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩

প্রতিদিন পদ্মা গর্ভে বিলীন হচ্ছে শত শত বিঘা জমি, ঝুঁকিতে বসতবাড়ি

[print_bangla]

হৃদয় রায়হান, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি-

বর্ষণ ও উজানের ঢলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা নদীসহ মাথাভাঙ্গা ও হিসনা নদীর পানি বাড়ছে ক্রমাগত। অপরদিকে গড়াই নদীতেও পানি প্রবাহ বেড়েছে। সেই সঙ্গে নদীসংলগ্ন অন্তত চারটি জায়গায় দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দৌলতপুর  উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের ভূরকা-হাটখোলা, কোলদিয়াড়, মাজদিয়াড় ও ফয়জুল্লাহপুরসহ প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় শত শত বিঘা জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও শত শত বিঘা জমি নিয়ে ঝুঁকিতে আছেন তারা। এ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এলাকার হাজারো মানুষ। স্থানীয় কৃষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গত ১৫-২০ দিনের মধ্যে পদ্মার ভাঙনে কোলদিয়াড় থেকে পাশের ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াদহ পর্যন্ত এলাকায় শতাধিক একরেরও বেশি আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। চলতি মৌসুমে বিস্তীর্ণ মাঠের পাট, আম-কাঁঠালের বাগানসহ নানা মৌসুমি ফসলসহ জমি হারিয়েছেন কয়েকশ কৃষক।
এক সময় যাদের ছিল সুখের সংসার, ক্ষেতভরা ফসল আর গোলাভরা ধান, সর্বনাশা পদ্মা নদীর থাবায় তারা সর্বস্বান্ত। তাদের চোখে-মুখে শুধু বিষাদের ছায়া, অনিশ্চয়তার ছাপ। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, ফসলি জমির মতো ভিটেমাটিও কি চলে যাবে নদীর পেটে? কোলদিয়ার গ্রামের রফিকুল ইসলাম তাঁর দুর্দশার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের মোট ৭ বিঘা জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। গত দুই সপ্তাহের তাণ্ডবেই হারিয়েছি প্রায় এক বিঘা জমি।’ বাড়িটি ছাড়া এখন আর তাঁর কিছুই নেই। সেই বাড়িও ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে।
নদী ভাঙনে ২০ বিঘারও বেশি জমি হারানো ভূরকাপাড়া গ্রামের মহাবুল ইসলাম বলেন, এখন তাঁর শুধু মাথা গোঁজার শেষ সম্বল বসতবাড়িই অবশিষ্ট আছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে খুব শিগগির সেটিও হারিয়ে পথের ফকির হতে হবে তাঁকে।
নদী তীরে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মর্জিনা খাতুন বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে এই মাঠে ১৪ বিঘা জমি করেছিলাম। পদ্মার গ্রাসে সব শেষ হয়ে গেল! আমার ঘরে কর্মক্ষম স্বামী ও তিন সন্তানসহ মোট পাঁচজনের সংসার। তীব্র অভাবে কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে।’ সরকারের কাছে তাদের একটাই আকুতি, অন্তত বসতবাড়িটুকু রক্ষার ব্যবস্থা করা হোক। একইভাবে নদীতীরে এসে অসহায়ের মতো আকুতি জানাচ্ছিলেন বিউটি খাতুন, শুকরুন্নেসা, তবারক হোসেন ও আব্দুল রশিদসহ অনেকে। এদের কারও ভেঙেছে ২৫ বিঘা, কেউ কেউ হারিয়েছেন ১০ বিঘা, কারও গেছে ৪-৫ বিঘা জমি।
ভূরকাপাড়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আতর আলী বলেন, প্রতিদিন চোখের সামনেই নদীতে বিলীন হচ্ছে জমি। শত শত কৃষক আজ পথে বসেছেন। তাই তারা সাময়িক দয়া নয়, নদীভাঙন থেকে এলাকা রক্ষায় সিমেন্টের স্থায়ী ব্লকের বাঁধ চান। একই এলাকার জাকির হোসেন বলেন, ভূরকাপাড়ার সামান্য একটি অংশে বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলায় সেখানে ভাঙন কিছুটা কম। কিন্তু কোলদিয়াড়, হাটখোলাপাড়া হয়ে রায়টা পর্যন্ত বিশাল এলাকা সম্পূর্ণ অরক্ষিত। প্রতিদিন জমি ভেঙে নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে।
পদ্মার তীব্র ভাঙনে জাতীয় ও স্থানীয় ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক অবকাঠামো ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে। নদী ভাঙনের সীমানার মাত্র ৫০০ ফুট দূরে রয়েছে ভারত থেকে আসা ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। যে কোনো সময় সঞ্চালন টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া নদীর ঢেউ সরাসরি আঘাত হানছে ঐতিহ্যবাহী রায়টা-মহিষকুণ্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর।
ঝুঁকির মুখে রয়েছে নদী ভরাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভূরকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় কান্দিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও জুনিয়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। একই সঙ্গে হাটখোলাপাড়া জামে মসজিদ, জুনিয়াদহ বাজার এবং ভূরকা, কোলদিয়াড়, জুনিয়াদহ ও কোলদিয়াড় পূর্বপাড়াসহ কয়েকটি পুরো গ্রামের বাসিন্দারা সব হারানোর ঝুঁকিতে আছেন।
এলাকাবাসী জানান, পদ্মা এখন আর ফসলের মাঠে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সরাসরি বাঁধের নিচে চলে এসেছে। এখনই জরুরি পদক্ষেপ না নিলে বিস্তীর্ণ গ্রাম ও শত শত ঘরবাড়ি রক্ষা করা সম্ভব হবে না। কুষ্টিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর ইসলাম বলেন, পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সম্প্রতি ভাঙন কবলিত অঞ্চল পরিদর্শন করেছেন। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি আপৎকালীন কাজ ও ভবিষ্যতে নদীর গতিপথ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে প্রাক্কলন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন ও বাজেট পাওয়া মাত্রই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, দৌলতপুর অঞ্চলে পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তাবনা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কয়েক দফায় কথা হয়েছে। তিনি আশ্বস্তও করেছেন। বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে আড়াই-তিন কোটি টাকার বাজেট চেয়েছেন। টেকসই নদী শাসনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের দাবি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে কুষ্টিয়া শহরের কোল ঘেঁষে প্রবাহিত গড়াই নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।  ভাঙন দেখা দিয়েছে ঘোড়াই ঘাটসহ বিভিন্ন স্থান।  দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে অনেক স্থাপনা। তাই দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী এলাকাবাসীর। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রতিদিন পদ্মা গর্ভে বিলীন হচ্ছে শত শত বিঘা জমি, ঝুঁকিতে বসতবাড়ি

২৯ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top