
জহির রায়হান, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি-
কাউনিয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার মান ও ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা দিন দিন কমতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ শুন্য থাকায় লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। ফলে শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিম্নমূখী হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ছুটছে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের দিকে। সরেজমিনে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি কম। কোনো বিদ্যালয়ে ২০-২৫ জন, আবার কোথাও ৫০-৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। মোট শিক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের উপস্থিতি দেখা যায়নি। তবে বিদ্যালয়ের ভর্তি খাতায় উপস্থিতির সংখ্যা অনেক বেশি। শিক্ষার নিম্নমানের দিকে ধাবিত হওয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর হার কমেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। প্রতিবছরই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির পরিমাণ কমছে।
অভিভাবকরা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা নিম্নমানের ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে । খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বাজার বা সড়কের পাশের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি থাকলেও গ্রামের স্কুল গুলোতে উপস্থিতি খুব কম। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যালয়ে অবকাঠামো ভালো হলেও ভিতরের পড়াশোনার মান নিম্নের দিকে যাচ্ছে।
সরকারি প্রতিটি স্কুলে কাগজপত্রে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি রয়েছে। তবে এসব পরিচালনা কমিটি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বা শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সচেতন অভিভাবকেরা জানান, প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না। কারণ, যারা এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা, তাদের সন্তানদের এসব স্কুলে ভর্তি করানো হয় না। এসব স্কুলের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানাগেছে, উপজেলায় বর্তমানে ১ম শ্রেনী থেকে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত ডিআর ভুক্ত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ২৫ হাজার ৪শত ৭৭জন। উপজেলার ১১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫০ টিতে প্রধান শিক্ষক নেই, ৩০টি সহকারী শিক্ষক পদ শুন্য। ফলে সহকারী শিক্ষক দিয়ে জোরাতালি দিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। ৫০টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষক দিয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করায় অফিসিয়াল কাজ সহ নানা ধরনের কাজ করতে গিয়ে সঠিক সময়ে ক্লাশ নিতে পারেন না। এছারাও ৩০টি বিদ্যালয়ে ৩০জন সহকারী শিক্ষক পদ শুন্য থাকায় সেই বিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণ ক্লাশ হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে পদ শুন্য থাকায় শিক্ষার মান নিম্নমূখী হচ্ছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, ঠিকমত ক্লাশ হয়না, সরকারি বন্ধ, ভালো পরিবেশ নেই, দরিদ্র মানুষের সন্তানরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে,তারা তাদের বিদ্যালয়ে শনিবার ক্লাশ নেন,সরকারি বন্ধেও তারা ক্লাশ নেন, এইসব বলে ভুলভাল অভিভাবকদের বুঝিয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পরিচালক তাদের প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি করান। এছারাও বেশ কিছু অভিভাবক ঋণ সহয়তা, খাদ্য সহয়তাসহ নানা সহযোগিতার আশ্বাসে তাদের আদরের সন্তানদের এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয় ও আখেরাতে ভালো থাকার আশায় হাফেজিয়া মাদ্রাসা গুলোতে সন্তানদের ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে দিনদিন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রী কমে যাচ্ছে।
অনেক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেছেন গ্রামের অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা সঠিক নিয়মে আন্তরিকতার সাথে ক্লাশ নেন না, ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রাথমিক বিদ্যালয় বিমূখ হচ্ছে। অপরদিকে অভিযোগ রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ অভিবাভকরা তাদের সন্তানরা বিদ্যালয়ে গেল কিনা সে খবর তারা রাখেন না, বিশেষ করে চরাঞ্চল গুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্র ভিন্ন । শুধু উপবৃত্তির সময় হলে অভিভাবক স্কুলে গিয়ে খোঁজ নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক জানান, বছরের শুরুতে শিক্ষা অফিস থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আগে কিন্ডারগার্টেন গুলোতে বই দেয়া হয়। এতো গুলো প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকার পরও কিভাবে এতোগুলো কিন্ডারগার্টেনের অনুমোদন দেয়া হলো সেটি বড় প্রশ্ন? এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম। পরীক্ষার সময় উপস্থিতি কিছুটা বাড়ে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। আমরা প্রতিনিয়ত বিদ্যালয় ভিজিট করছি, তদরকি করছি, মা সমাবেশ সহ শিক্ষার মান উন্নয়নে নানা মূখি পদক্ষেপ গ্রহন করছি। শিক্ষক সংকটের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জে/এ
