
এমএফএইচ রাজু | ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও শিক্ষককে হয়রানিসহ ২৩টি অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেছে।
১৩ সেপ্টেম্বর ইউএনও ও বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান স্বাক্ষরিত শোকজ নোটিশে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। নোটিশে উল্লেখিত বিভিন্ন আর্থিক অঙ্কের সরল যোগফল ১ কোটি ১৫ লাখ ৫ হাজার ৮৩০ টাকা। তবে এটি চূড়ান্তভাবে আত্মসাৎ বা দুর্নীতির মোট পরিমাণ নয়, নোটিশে উল্লিখিত বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অঙ্কের যোগফল।
নোটিশের একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণি থেকে আদায়কৃত অর্থসহ অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া আনুমানিক ৭৯ লাখ ৪ হাজার ৩৩০ টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে এবং আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন না নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিস্তারিত অংশে জানুয়ারি ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৭৫৪ টাকার ভুয়া বিল ও ভাউচার তৈরির এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ২৯ লাখ ৬ হাজার ৫৭৬ টাকার হিসাব না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুই অঙ্কের যোগফলই ৭৯ লাখ ৪ হাজার ৩৩০ টাকা।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের আয় ব্যাংকে জমা না রেখে নগদ অর্থ হিসেবে হাতে রাখা, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ ব্যয় এবং বিভিন্ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ব্যয়ের অনুমোদন রেজুলেশন বইয়ে লিপিবদ্ধ না করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যয়ের সময় ভ্যাট ও আয়কর কর্তন না করে গত আড়াই বছরে সরকারের প্রায় ১২ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। বিভিন্ন ভাউচারে রাজস্ব স্ট্যাম্প ব্যবহারের আইনগত বাধ্যবাধকতা অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে।
নোটিশে অভিযোগ করা হয়, অর্থের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে নতুন ভর্তি হওয়া এক ছাত্রীকে নিয়মিত ছাত্রীদের আগে রোলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি ওই ছাত্রীকে ৪ নম্বর রোল দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। উপবৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রীদের কাছ থেকে নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও মাসিক বেতন নেওয়া এবং উপবৃত্তির বিপরীতে পাওয়া টিউশন ফি শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ না করার অভিযোগও রয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের ঋণকে বিদ্যালয়ের আয় হিসেবে দেখিয়ে পরে বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে তা পরিশোধের নামে জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেওয়া ও আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে PBGSI স্কিমের আওতায় পাওয়া প্রায় ৫ লাখ টাকা বিধিমতো ব্যয় না করে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্কিম পরিচালকের কাছে ফেরত দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে ২০ জন সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রী, পাঁচজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছাত্রী, শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম বঞ্চিত হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে ল্যাব ফি নেওয়া হলেও বিদ্যালয়ের ল্যাব সচল না রাখার অভিযোগ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক ক্লাস থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছাড়া এককভাবে সভা করে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রায় ১১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের ক্যাশ বই যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা এবং ব্যাংক হিসাবে লেনদেনসহ বিভিন্ন আয়-ব্যয়ের তথ্য ক্যাশ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত না করার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া কমিটির অনুমোদন ছাড়া শিক্ষকদের বেতনের স্কুল অংশের টাকা বন্ধ করে দেওয়া, কমিটির সিদ্ধান্তের পরও অনুমোদন ছাড়া সাদা কাগজে বাড়িভাড়া ভাতা গ্রহণ, সমিতি থেকে প্রশ্নপত্র কিনে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা নেওয়া এবং সহকারী শিক্ষক মোসা. সেলিনা আক্তারের বিয়ে, বয়স, গায়ের রং ও পোশাক নিয়ে অশালীন ও আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের সামনে অবস্থিত একটি হোটেলের ব্যবহারের জন্য হোটেল মালিক মো. জামাল মুন্সীর কাছে বিদ্যালয়ের তিনটি বেঞ্চ ও একটি টেবিল ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করার অভিযোগও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ের সভায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে অভিযোগনামা পাওয়ার পর ১০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নিতে চান কি না, সেটিও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে জবাব না দিলে অথবা জবাব সন্তোষজনক না হলে বিধি অনুযায়ী তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে নোটিশে জানানো হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী অদক্ষতা, পেশাগত অসদাচরণ, কর্তব্যে অবহেলা, দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনজনিত শাস্তির আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাকে কেন চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত দণ্ড দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান বলেন, তাকে শোকজ করা হয়েছে। তাকে ১০ কার্যদিবস সময় দিয়েছি। সে যদি প্রমাণ করতে পারে, তাহলে সে অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকবে। আর যদি জবাব দিতে না পারে, তাহলে আমরা বিধি মোতাবেক তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারি অথবা বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠাতে পারি। একই সঙ্গে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারি। তারা অধিকতর তদন্ত করে যে প্রতিবেদন দাখিল করবে, তার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে সবগুলোরই সত্যতা মিলেছে।
এর আগে কয়েকজন সহকারী শিক্ষকের লিখিত অভিযোগের পর ১৬ আগস্ট ইউএনও বিদ্যালয়ে গিয়ে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করেন। পরে ১৮ আগস্ট শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষকের অপসারণের দাবিতে উপজেলা কমপ্লেক্সে গিয়ে অবস্থান করলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে আরও তদন্ত শুরু হয়।
প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য দেওয়ার কথা জানান। তবে পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।