রবিবার ১৪ই জুন, ২০২৬ ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ত্যাগের মহিমায় নীলাকাশ

[print_bangla]

বিধান চন্দ্র সান্যাল

সবুজ মফস্বল শহর বালুরঘাটের বুক চিরে বয়ে চলা আত্রাই নদীর তীরবর্তী এলাকা ‘রামচন্দ্রপুর’। সেখানে পাশাপাশি দুটি বাড়ি-একটিতে থাকেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক রহমত শেখ, অন্যটিতে মৃৎশিল্পী নগেন পাল। রহমত শেখদের পরিবার চার পুরুষ ধরে এই শহরে বাস করছে, আর নগেন পালের পূর্বপুরুষেরা কুমোরটুলি থেকে এসে এখানে স্থায়ী হয়ে ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুই পরিবারের সম্পর্ক কেবল প্রতিবেশী বা ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি,তা পরিণত হয়ে ছিল এক অবিচ্ছেদ্য আত্মীয়তায়। জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকেই দুই বাড়িতে শুরু হয়ে যায় উৎসবের প্রস্তুতি। রহমত শেখদের উঠোনে প্রতি বারের মতো এবারও একটি স্বাস্থ্যবান গরু আনা হয়েছে। কিন্তু এবার রহমত শেখের মনটা বেশ ভারাক্রান্ত। কারণ তাঁর একমাত্র ছেলে আরমান এবার চাকরির সুবাদে সুদূর দুবাইয়ে আটকে পড়েছে। প্রতি বছর ছেলে আরমানকে সাথে নিয়ে রহমত শেখ নিজে হাটে যেতেন, পছন্দ করে খাসি কিনতেন। এবার বয়সের ভারে আর একার শরীর না চলায় চিন্তায় পড়ে ছিলেন তিনি।
রহমত শেখের এই মানসিক টানাপোড়েন ও চিন্তার কথা বুঝতে বাকি রইল না পাশের বাড়ির নগেন পালের। তিনি নিজের জমানো কিছু কাজ অসমাপ্ত রেখেই সকাল সকাল রহমতদের বাড়ি হাজির হলেন। নগেন রহমত শেখের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “কী গো চাচা? মুখ এমন ভার কেন? আরমানের কথা ভাবছ তো? ও না এলে কী হয়েছে, আমি তো আছি। আমাকে শুধু কাজের তালিকাটা ধরিয়ে দাও, পশুর হাটে যাওয়া থেকে শুরু করে সব ব্যবস্থা আমি নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছি।”
নগেনের এই আন্তরিকতা ও সম্প্রীতির কথা শুনে রহমত শেখের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, “নগেন, তুমি না থাকলে আজ আমার কী হতো! তুমি যে অন্য ধর্মের, তা তো কখনও মনেই হয় না। এই তো আমাদের আসল উৎসব-ত্যাগ ও মানবতার।”
নগেন মুচকি হেসে বললেন, “ধর্ম তো আমাদের ভালোবাসতে শেখায় চাচা। উৎসব তো সবার। চলেন, হাটে যাওয়া যাক।” নগেন নিজেই রহমত শেখকে নিয়ে আত্রাই নদীর ওপারে পশু কেনাবেচার হাটে গেলেন। অনেক ঘুরে একটি চমৎকার মাঝারি আকৃতির খাসি পছন্দ করলেন নগেন। দাম একটু বেশি চাওয়া হলেও নগেন নিজের দরাদরি করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সঠিক দামেই খাসিটি ক্রয় করলেন। খাসিটি কিনে যখন তারা বাড়ি ফিরছিলেন, তখন দুপুরের রোদ বেশ কড়া হয়ে উঠেছে।
বাড়ি ফেরার পথে রহমত শেখ হঠাৎ লক্ষ্য করলেন নগেনের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। বয়সের তুলনায় নগেনও এখন আর আগের মতো শারীরিক পরিশ্রম করতে পারেন না। রহমত শেখ আক্ষেপের সুরে বললেন, “নগেন, তুমি আমার জন্য বড় কষ্ট করলে। এই রোদ আর বয়সে তোমার এতটা না খাটলেও চলত।”
নগেন পাল হাসি মুখে উত্তর দিলেন, “আরে চাচা, এটুকু কষ্ট না করলে প্রতিবেশীর বিপদে দাঁড়ানোর কী অর্থ থাকে? ত্যাগের আসল আনন্দ তো এখানেই। আমাদের ধর্ম আলাদা হতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর বা আল্লাহর সৃষ্টি তো একই। এই আত্মত্যাগ এবং অন্যের সুখে সুখী হওয়ার শিক্ষাই তো সব ধর্ম দেয়।” পরের দিন এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত আনন্দের দিন-পবিত্র ঈদুল আযহা। ভোরের মিষ্টি আলোয় চারদিক ঝলমল করছে। রহমত শেখ ও নগেন পাল এক সঙ্গে ঈদগাহ মাঠের দিকে রওনা হলেন। নামাজ শেষে সবাই যখন একে অপরের সঙ্গে বুকে বুক মিলিয়ে কোলাকুলি করছেন, তখন নগেন পালও রহমত শেখকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ঈদ মোবারক, রহমত ভাই!” রহমত শেখের দুই চোখ তখন আনন্দে ভিজে উঠেছে। এই কোলাকুলির মাধ্যমে যেন দুই ধর্মের মানুষের মধ্যকার সমস্ত দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
ঈদের জামা শেষে আসল কাজ শুরু হলো-কুরবানির পশু জবাই ও মাংস বণ্টন। রহমত শেখের বাড়ির সামনে সকাল থেকেই গ্রামের দরিদ্র ও অভাবী মানুষ জড়ো হতে শুরু করেছেন, নগেন পাল কোনো দ্বিধা ছাড়াই কসাইদের সঙ্গে হাত লাগালেন এবং তদারকি করতে লাগলেন, নিয়ম অনুযায়ী কুরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করা হলো-এক ভাগ আত্মীয় স্বজনের জন্য, এক ভাগ গরিব-দুঃখীদের জন্য এবং এক ভাগ নিজেদের জন্য। রহমত শেখ নগেন পালের হাতে এক বড় প্যাকেট মাংস তুলে দিয়ে বললেন, “নগেন, এই প্রথম ভাগের মাংসটুকু তোমার বাড়ির জন্য। আমার পরিবারের সবাই তোমার পরিবারের ওপর নির্ভরশীল।” নগেন পাল সেই মাংসের প্যাকেটটি সাদরে গ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, “চাচা, আপনার দেওয়া এই মাংস আজ আমার বাড়িতে ঈদের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেবে, ত্যাগের আসল মহিমা তো তখনই সার্থক হয়, যখন সেই ত্যাগের ফল সবার মধ্যে ভাগ করে নেওয়া যায়।” দুপুরের দিকে রহমত শেখের মোবাইল বেজে উঠল। সুদূর দুবাই থেকে ভিডিও কলে আরমান যুক্ত হয়েছে। আরমান তার বাবাকে স্ক্রিনে দেখেই সালাম জানাল এবং বলল, “বাবা, তোমাদের খুব মিস করছি। নগেন কাকু আমাকে ভিডিও কল করে সব দেখিয়েছেন। তিনি যে ভাবে তোমাদের দেখভাল করছেন, তাতে আমি দুবাইয়ে অনেক নিশ্চিন্তে আছি।”
আরমানের কথা শুনে রহমত শেখের বুকটা গর্বে ফুলে উঠল। তিনি নগেনকে ডাকলেন এবং আরমানের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিলেন। নগেন আরমানকে আশ্বস্ত করলেন যে, তার বাবার কোনো কাজে তিনি কোনো রকম অসুবিধা হতে দেবেন না। বিকেলের দিকে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখা গেল। নগেন পালের স্ত্রী মায়া দেবী নিজের হাতে পায়েস এবং কয়েক পদের মিষ্টি বানিয়ে রহমত শেখের বাড়িতে নিয়ে এলেন। তিনি রহমত শেখের হাতে প্লেটটি তুলে দিয়ে বললেন, “ভাইজান, কুরবানির এই পবিত্র দিনে আপনাদের বাড়ি মিষ্টি মুখ না করালে আমাদের ঈদ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।” রহমত শেখ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা সেই পায়েস খেলেন এবং অকৃত্রিম ধন্যবাদ জানালেন। নগেন পালের বাড়ির তৈরি এই মিষ্টি আর রহমত শেখের বাড়ির কুরবানির মাংসের সংমিশ্রণে যেন রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাতাসে এক স্বর্গীয় সম্প্রীতির সুবাস ছড়িয়ে পড়ল।
গোধূলি লগ্নে রহমত শেখ তাঁর ঘরের বারান্দায় বসে বাইরের পরিবেশ দেখছিলেন। আত্রাই নদীর ওপার থেকে ভেসে আসছে পাখির কলকাকলি। তিনি ভাবছিলেন, ঈদুল আযহার প্রকৃত অর্থ কী? কেবল পশু কুরবানি দেওয়া তো এর মূল উদ্দেশ্য নয়। এর মূল শিক্ষা হলো নিজের ভেতরের সব হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়া। মানুষ হিসেবে অন্যের দুঃখ-কষ্ট বোঝা এবং সব ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার জয়গান গাওয়া।
তিনি মনে মনে উপলব্ধি করলেন যে, আজ তাঁর ছেলে বিদেশে থেকেও তিনি একা নন। নগেনের মতো একজন প্রকৃত বন্ধু ও প্রতিবেশীর জন্যই আজ এই ঈদুল আযহার ত্যাগ ও সম্প্রীতির বার্তাটি এত উজ্জ্বল ও সার্থক রূপ লাভ করেছে। ঠিক সেই সময় নগেন পাল এসে রহমত শেখের পাশে বসলেন। দু’জনের মধ্যে কোনো কথা হলো না, তারা কেবল নীরবে সূর্যাস্ত দেখতে লাগলেন। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও যেন ফুটে উঠল মানবতার এক চিরন্তন বাণী-ধর্ম যার যার, উৎসব ও মানবতা সবার। এই ত্যাগ ও সম্প্রীতির শিক্ষাই মানবজাতিকে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখবে, আর এভাবেই সব ধর্মের মানুষ একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াবে ।
পরবর্তীতে রহমত শেখ ও নগেন পাল মিলে শহরের অন্যান্য দরিদ্র মানুষের মাঝেও মাংস বিতরণ করলেন। সবাই তাদের এই সম্প্রীতি দেখে মুগ্ধ হলেন। গ্রামের মোড়ে দাঁড়িয়ে অনেকেই বলাবলি করছিলেন, “রহমত আর নগেন-এই দুই বন্ধুর ভালোবাসা দেখলে মনে হয় ধর্ম কোনো দেয়াল নয়, বরং মানুষকে কাছে টানার এক সুন্দর সেতু।” এ ভাবেই ত্যাগের মহিমা ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রহমত ও নগেনের জীবনে আরও একটি অর্থপূর্ণ ঈদুল আযহা উদযাপিত হলো। আরমান দুবাই থেকে ফিরে এসে এই গল্প শুনে আরও অনুপ্রাণিত হবে এবং সেও তার বাবার ঐতিহ্য ও আদর্শ ধরে রাখবে। এই দুই পরিবারের সম্পর্ক যেন  আগামী দিনগুলোতে সমাজের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ত্যাগের মহিমায় নীলাকাশ

২৭ মে ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top