রবিবার ১৪ই জুন, ২০২৬ ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

হরিণাকুণ্ডুতে বোনের বাড়ি বেড়াতে এসে সাপের কামড়ে নারীর মৃত্যু: কুসংস্কার এবং অসচেতনতা দায়ী 

[print_bangla]

মাকসুদুল হক, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:

শনিবার ১৩ জুন ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে বিষধর সাপের কামড়ে হাফিজা বেগম (৪৫) নামের এক নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গত রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় কাপড়ের ভেতর ঢুকে পড়া সাপটিকে তিনি নিজের সাহসিকতায় ধরে ফেলেন। তবে পরবর্তীতে দ্রুত হাসপাতালে না গিয়ে গ্রাম্য কবিরাজের কাছে গিয়ে ঝাড়ফুঁক ও কুসংস্কারের মায়াজালে পড়ে শেষ রক্ষা হয়নি তাঁর। ঝিনাইদহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। নিহত হাফিজা বেগম কুষ্টিয়ার ইবি থানার ঝাউদিয়া মাঝপাড়া গ্রামের খাকচার আলীর স্ত্রী। তাঁর এই আকস্মিক ও বেদনাদায়ক মৃত্যুতে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাফিজা বেগম বেশ কয়েকদিন আগে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নের সোহাগপুর গ্রামে তাঁর ( মৃত মোরাদ আলীর স্ত্রী) বোন জাহানারা খাতুনের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। গতকাল রাতের খাবার শেষে তিনি ঘরে বোনের নাতিদের নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। রাতের কোনো এক সময় একটি বিষধর সাপ তাঁর গায়ের কাপড়ের ভেতর ঢুকে পড়ে এবং কামড়ে দেয়। এ সময় চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে হাফিজা বেগম কাপড়ের ওপর থেকেই বিষধর সাপটিকে চেপে ধরে ফেলেন।
সাপসহ হাফিজা বেগমকে উদ্ধার করে পরিবারের লোকজন দ্রুত স্থানীয় গ্রাম্য কবিরাজ মোয়াজ্জেম মালিতার কাছে নিয়ে যান। সেখানে কবিরাজ দীর্ঘক্ষণ ঝাড়ফুঁক করে শরীর থেকে বিষ নামানো হয়েছে বলে দাবি করেন। কবিরাজের কথায় আশ্বস্ত হয়ে এবং বিষ নেমে গেছে ভেবে ধরা পড়া সাপটি ওই কবিরাজের কাছেই জমা দিয়ে হাফিজা বেগমকে নিয়ে স্বজনরা বোনের বাড়িতে ফিরে আসেন এবং সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যান। কিন্তু এর কিছুক্ষণের মধ্যেই হাফিজা বেগম প্রচণ্ড শারীরিক অসুস্থতা বোধ করেন এবং দ্রুত তাঁর পেট ফুলতে থাকে। অবস্থার অবনতি দেখে সচেতন ভাবে হাসপাতালে না নিয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবারের লোকজন তাঁকে আবার ওই কবিরাজের কাছেই নিয়ে যান। এ সময় পরিবারের সদস্যরা অলৌকিক কুসংস্কারে বিশ্বাস করে বলতে থাকেন, সাপটিকে আটকে রাখার কারণেই মূলত শরীর থেকে বিষ নামছে না। এরপর তারা কবিরাজকে অনুরোধ করে সাপটিকে তাফের বাড়ির পাশে অবমুক্ত করে দেন।
এদিকে স্থানীয় সাপুড়ে, কবিরাজ বা অন্য কেউ সাপটিকে নির্দিষ্ট করে শনাক্ত করতে পারেনি। তবে কবিরাজ মোয়াজ্জেম মালিতার ভাষ্যমতে, সাপটি প্রায় দেড় ফুটের মতো লম্বা এবং এর গায়ে বেশ উজ্জ্বল কালো রঙের ছোপ ছোপ দাগ ছিল। সাপটি ছেড়ে দেওয়ার পরও হাফিজা বেগমের অবস্থার কোনো উন্নতি না হয়ে বরং আরও বেগতিক হতে থাকে। পরে অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে পরিবারের লোকজন কবিরাজি চিকিৎসা বাদ দিয়ে তাঁকে দ্রুত ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ বিকেল ৫ টার সময় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, সাপে কাটার পর ওঝা বা কবিরাজের কাছে ঝাড়ফুঁক করে কালক্ষেপণ না করে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে রোগীকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি। কিন্তু এই রোগীর ক্ষেত্রে পেট ফুলে যাওয়ার মতো বিষক্রিয়ার স্পষ্ট লক্ষণ দেখার পরও হাসপাতালে আনতে অনেক দেরি করা হয়েছে, যা তাঁর মৃত্যুর প্রধান কারণ। হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম রয়েছে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি শতভাগ রোধ করা সম্ভব। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হরিণাকুণ্ডুতে বোনের বাড়ি বেড়াতে এসে সাপের কামড়ে নারীর মৃত্যু: কুসংস্কার এবং অসচেতনতা দায়ী 

১৪ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top