শনিবার ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৪ঠা আশ্বিন, ১৪৩৩

সততার শেষ প্রহর

[print_bangla]

বিধান চন্দ্র সান্যাল-

সকাল আটটার লোকাল ট্রেনটার মতোই সুব্রতবাবুর চশমার কাচটা একটু ঝাপসা হয়ে থাকে সব সময়। মধ্যবিত্তের সৎ জীবনযাপনের যে দেওয়ালটা তিনি পঁচিশ বছর ধরে খাড়া করেছেন, আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে সেটার গায়ে বড় একটা ফাটল ধরেছে। খাবারের টেবিলে বসে সুব্রতবাবু খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলেন। তাঁর স্ত্রী মাধুরী এক কাপ চা সামনে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “অর্কের কলেজের শেষ কিস্তির টাকাটা আজ বিকেলের মধ্যে জমা দিতেই হবে, শুনছ? আর কোনো ভাবেই সময় বাড়াবে না বলেছে।” মাধুরীর গলায় একটা চাপা উৎকণ্ঠা।
সুব্রতবাবু চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “জানি মাধুরী। কিন্তু প্রভিডেন্ট ফান্ডের লোনটা পাস হতে আরও অন্তত সাত দিন লাগবে। আমি কলেজের প্রিন্সিপালকে অনুরোধ করে দেখেছি, উনি নিয়ম ভাঙতে রাজি নন।” ঠিক তখনই ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো তাদের পঁচিশ বছরের ছেলে অর্ক। এমবিএ-র শেষ সেমিস্টার। তার চোখে এক বুক স্বপ্ন, কিন্তু কপালে চিন্তার ভাঁজ। সে সোজা বাবার সামনে এসে বসল। “বাবা, আমি সমীরকাকুর সঙ্গে কথা বলেছি,” অর্ক একটু ইতস্তত করে বলল। সুব্রতবাবুর হাত থেকে চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর শব্দ করে নেমে এল। সমীর তাঁর অফিসের সেই ঠিকাদার, যে ফাইলের দ্রুত অনুমোদনের জন্য টেবিলের তলা দিয়ে টাকা দিতে ওস্তাদ। সুব্রতবাবু চিরকাল তাকে এড়িয়ে চলেছেন।
“সমীর! ওর সাথে তোমার কী কথা?” সুব্রতবাবুর গলা শক্ত হয়ে উঠল। “সমীরকাকু বললেন, তোমার টেবিলে ওঁর যে নতুন প্রোজেক্টের ফাইলটা আটকে আছে, ওটায় একটা সই করে দিলে উনি আজ দুপুরের মধ্যেই আমার কলেজের পুরো টাকাটা নগদ দিয়ে দেবেন। পরে লোন পাস হলে তুমি শোধ করে দিও,” অর্ক একনাগাড়ে বলে গেল। সুব্রতবাবু কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর চড়া গলায় বললেন, “তুমি আমাকে ঘুষ নিতে বলছ অর্ক? যে সততার ওপর দাঁড়িয়ে এই সংসারটা চলছে, তাকে বিক্রি করে দেব?” মাধুরী এবার স্বামীর হাতটা ধরলেন। তাঁর গলায় কান্নার সুর, “সততা দিয়ে কি ছেলের ভবিষ্যৎ গড়া যায়, সুব্রত? যদি আজ টাকাটা জমা না পড়ে, ওর একটা বছর নষ্ট হয়ে যাবে। ও কোনো অন্যায় করেনি, তবে কেন ও শাস্তি পাবে?”
সুব্রতবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের এক কোণে রাখা ওনাদের পুরনো কাঠের আলমারিটার দিকে তাকালেন। ওটার একদিকের পাল্লাটা একটু ঝুলে পড়েছে, ঠিক মতো বন্ধ হয় না। ঠিক তাঁদের জীবনের মতোই। তিনি অর্কের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অর্ক, সমীরের ওই প্রোজেক্টে ভেজাল মালপত্রের খতিয়ান আছে। আমি সই করলে কত বড় ক্ষতি হতে পারে জানো? একটা বহুতল ভেঙে পড়তে পারে।” অর্ক মাথা নিচু করে বলল, “আমি জানি বাবা। কিন্তু আজ যদি আমি পরীক্ষা দিতে না পারি, আমার চাকরি পাওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যাবে। এই বাজারে একটা চাকরি কতটা দরকার তুমি জানো না? তোমার সততার জন্য আমি কেন ভুক্তভোগী হব?” ছেলের এই একটা প্রশ্ন সুব্রতবাবুকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সংকট এটাই-নিজের আদর্শ যখন নিজেরই সন্তানের স্বপ্নের সামনে পাঁচিল হয়ে দাঁড়ায়।
সুব্রতবাবু কোনো উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অফিস যাওয়ার পথে বাসে, ট্রেনের ভিড়ে, চেনা মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে ওঁর মনে হতে লাগল, সবাই যেন কোনো না কোনো আড়ালে একটা আপস লুকিয়ে রেখেছে। কেউ বেশি, কেউ কম। বিকেল চারটে। অফিসের ডেস্কে সুব্রতবাবুর সামনে সমীরের সেই লাল ফিতায় বাঁধা ফাইলটা রাখা। সমীর ওঁর কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে ফোনে হাসিমুখে কথা বলছে। সুব্রতবাবু কলমটা হাতে নিলেন। ওঁর হাতটা সামান্য কাঁপছিল। ওঁর মনে হলো, এই সইটা ওঁর চরিত্রের নয়, ওঁর এত বছরের অহংকারের মৃত্যুর পরোয়ানা। উনি চোখ বন্ধ করলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠল অর্কের হতাশ মুখ আর মাধুরীর চোখের জল। জে/এ

লেখক-বিধান চন্দ্র সান্যাল, পেশা-শিক্ষকতা

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সততার শেষ প্রহর

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top