
বিধান চন্দ্র সান্যাল-
বাঙালির প্রাত্যহিক যাপন, সংস্কৃতি চর্চা এবং সংবাদ প্রবাহের সাথে বেতার যন্ত্রটি যে গভীর ও অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে রয়েছে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘আকাশবাণী কলকাতা’। শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল একটি সম্প্রচার মাধ্যম নয়, বরং বাঙালির মনন গঠনের এক জীবন্ত আর্কাইভ বা সংগ্রহশালা। প্রযুক্তিগত বিবর্তন ও পরিবর্তনশীল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আকাশবাণী কীভাবে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রেখেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর আবেদন কতটা সুদূরপ্রসারী, তা এক সুদীর্ঘ পর্যালোচনার দাবি রাখে।
ভারতের সম্প্রচার ইতিহাসের সূচনাপর্বে ১৯২৭ সালের ২৬ আগস্ট ‘ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি’ (IBC)-র অধীনে ১ গার্স্টিন প্লেস, কলকাতা থেকে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালের ৮ জুন এটি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ (AIR) নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৫৬ সালে সংস্কৃত শব্দ ‘আকাশবাণী’ নামটি আনুষ্ঠানিক ভাবে গৃহীত হয়। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেতারের নামকরণে এই ‘আকাশবাণী’ শব্দটি ব্যবহার করে ছিলেন।
শুরুর দিন থেকেই এই কেন্দ্রটি বাংলার সাহিত্য, সংগীত এবং নাট্য জগতের দিকপালদের মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়ে ছিল। পঙ্কজ কুমার মল্লিক, রাইচাঁদ বড়াল, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, বাণীকুমার (বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য), হীরেন বসু প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের হাত ধরে কলকাতার বেতার জগৎ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে ছিল। তাঁদের সৃজনশীলতা শুধু বিনোদনই সরবরাহ করেনি, বরং বাঙালিকে শিকড়ের সন্ধানও দিয়েছে। আকাশবাণী কলকাতার সাথে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে আবেগপূর্ণ ও কালজয়ী অনুষ্ঠান হলো মহালয়ার ভোরে সম্প্রচারিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ এবং বাণীকুমারের রচনায় সুরের মায়াজাল বাঙালির শারদোৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ১৯৩০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানটি আজও তার আবেদন এতটুকু হারায় নি। আকাশবাণী কলকাতা প্রমাণ করেছে যে, পুরোনো ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেও কীভাবে আধুনিকতার ছোঁয়া দেওয়া যায়। প্রযুক্তির কল্যাণে আজ এই অনুষ্ঠান শুধু রেডিওতেই নয়, বরং আকাশবাণী কলকাতা ওয়েবসাইট-এর মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা উপভোগ করেন।
আকাশবাণী তার সম্প্রচারের শুরু থেকেই তিনটি প্রধান স্তম্ভ-তথ্য, শিক্ষা এবং বিনোদন-অক্ষুণ্ণ রেখেছে। সংবাদ পরিবেশন, কৃষি ভিত্তিক অনুষ্ঠান, শিক্ষামূলক কথিকা ও নাটক সম্প্রচারের মাধ্যমে এটি সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ‘কৃষি জগৎ’ বা গ্রামীণ অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কৃষকদের কাছে নতুন প্রযুক্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। এছাড়াও, ‘মহিলা মহল’ ও শিশুদের ‘গল্পদাদুর আসর’ সামাজিক মেলবন্ধনের এক দারুণ মাধ্যম ছিল। প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা নিয়মিত কথিকা পাঠের মাধ্যমে সমাজকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এই বহুমুখী অনুষ্ঠানের কারণে আকাশবাণী হয়ে উঠে ছিল সর্বস্তরের মানুষের নির্ভর যোগ্য সঙ্গী।
আকাশবাণী কলকাতা কেবল বিনোদন বা সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল না; এটি জাতীয় সংকটে সর্বদা জাতির পাশে দাঁড়িয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় গোপনে হোক বা প্রকাশ্যে, জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রসারে বেতারের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আকাশবাণী কলকাতা এবং ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ একযোগে লড়াই করেছিল। আকাশবাণীর সংবাদ ও বিশেষ অনুষ্ঠান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিপীড়িত মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়ে ছিল এবং বিশ্ব জনমত গঠনে অসামান্য অবদান রেখেছিল। ডিজিটাল বিপ্লব, এফএম রেডিও এবং ইন্টারনেট পডকাস্টের যুগে আকাশবাণী কলকাতার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তরুণ প্রজন্মের সাথে সংযোগ স্থাপন করা। বর্তমান সময়ে আকাশবাণীর ‘বিষয় ভাবনা’-তে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সনাতন মাধ্যমের পাশাপাশি নিউজ অন এয়ার (NewsOnAir) অ্যাপ-এর মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠানমালা লাইভ স্ট্রিম করা হচ্ছে। বিশ্বায়নের এই যুগে আকাশবাণী কলকাতা তাদের অনুষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাইজড করছে। পুরোনো আর্কাইভের রেকর্ডিংগুলোকে সংরক্ষণ করা হচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য। তরুণ শ্রোতাদের কথা মাথায় রেখে ‘যাদবপুর এফএম’ বা অন্যান্য যুব-কেন্দ্রিক অনুষ্ঠান এবং ইন্টারঅ্যাক্টিভ শো-এর প্রচার বাড়ানো হয়েছে। বাংলা ভাষার সঠিক উচ্চারণ ও প্রমিত বাংলার চর্চা বজায় রাখতে আকাশবাণী সর্বদা সচেষ্ট। খবরের ভাষা থেকে শুরু করে নাটক ও কথিকার ক্ষেত্রে ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষা করা হয়।
অতিমারি (যেমন-কোভিড-১৯) বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো সংকটময় মুহূর্তে আকাশবাণী কলকাতা নির্ভর যোগ্য ও যাচাইকৃত তথ্য পরিবেশনে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কোনো রকম গুজব বা বিভ্রান্তি ছাড়াই সরকারি নির্দেশিকা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সতর্কতা মূলক বার্তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বেতারের বিকল্প নেই। শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে আকাশবাণী কলকাতার মূল লক্ষ্য হলো-প্রযুক্তির আধুনিকায়নের সাথে নিজস্ব ঐতিহ্যের সমন্বয় সাধন। আগামীতে শ্রোতাদের আরও বেশি ইন্টারঅ্যাক্টিভ বা অংশগ্রহণমূলক অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। নতুন প্রজন্মের চাহিদার কথা মাথায় রেখে পডকাস্ট, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বেতার সম্প্রচারকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, দূর-দূরান্তের প্রান্তিক মানুষের কাছে সহজলভ্য ও ব্যাটারিচালিত রেডিওর মাধ্যমে খবর পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটি আজও আকাশবাণী নিষ্ঠার সাথে পালন করছে। ‘বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়’ এই মন্ত্রকে পাথেয় করে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলেছে।
শতবর্ষের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, আকাশবাণী কলকাতা নিছক কোনো সম্প্রচার যন্ত্রের গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই। এটি বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি, ভাষা এবং জীবনযাত্রার এক বিশ্বস্ত দলিল। আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে যখন দৃশ্যমাধ্যমের আধিপত্য প্রবল, ঠিক তখনও বেতারের নিজস্ব এক মুগ্ধতা রয়েছে, যা কোনোদিন ম্লান হওয়ার নয়। আকাশবাণী কলকাতা তার বিষয় ভাবনার আধুনিকীকরণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, সময় বদলালেও মানুষের মনের গভীরের ভাষা এবং সুরের আবেদন চিরন্তন। আগামী দিনগুলোতেও এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে নিজস্ব মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে থাকবে। জে/এ