
এম এ রশীদ, বিশেষ প্রতিনিধি:
বিয়ানীবাজার উপজেলায় তীব্র গরমে চরম আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ সংকট। দিনে ও রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকার পাশাপাশি গ্রাহকদের কাঁধে চেপেছে অস্বাভাবিক বা ‘ভুতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিলের বোঝা। এই দ্বিমুখী যন্ত্রণায় উপজেলার পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নের জনজীবন বর্তমানে প্রায় বিপর্যস্ত। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে ও রাতে মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। বিশেষ করে মাগরিবের নামাজের পর লোডশেডিংয়ের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করে, যার ফলে পুরো এলাকা দীর্ঘ সময় অন্ধকারে ডুবে থাকে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার কারণে টেলিভিশন, ফ্রিজ ও ফ্যানের মতো দামি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে চরম ঘাটতির পাশাপাশি গ্রাহকদের পোহাতে হচ্ছে অতিরিক্ত বিলের হয়রানি। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, আগের তুলনায় তাদের বর্তমান বিল এসেছে দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ। পান্না বেগম নামের এক ভুক্তভোগী নারী জানান, ব্যাংকে বিল দিতে গিয়ে দেখা যায় সার্ভারে কাগজের চেয়ে অনেক বেশি বিল উঠেছে। পরে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে সেটি সংশোধন করতে হয়েছে। জসিম উদ্দিন নামের আরেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, গত তিন মাস ধরে কোনো বিলের কাগজ না এলেও হঠাৎ লাইনম্যান এসে তার বাড়ির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।
বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কম্পিউটার ব্যবসায়ী হাসান ও মোয়াজ জানান, আইপিএস দিয়েও বেশিক্ষণ কাজ চালিয়ে রাখা যাচ্ছে না। মোবাইল চার্জ দেওয়া, ফটোকপি মেশিন চালানো কিংবা অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ঋণ বা দৈনিক কিস্তি পরিশোধ করা তাদের জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে জানান খলিল চৌধুরী হাইস্কুলের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা ও নাছুহা কবির। এছাড়া, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রোগী ও প্রবীণরা তীব্র গরমে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় প্রায় ১৮৩টি গ্রামকে ছয়টি ফিডারে ভাগ করা হয়েছে এবং মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৭০,২৫৫ জন। উপজেলা সদর এলাকার ১ নম্বর ফিডারের আওতায় থানা, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও উপজেলা পরিষদ থাকায় ওই এলাকায় কিছুটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ দেওয়া হলেও বাকি ফিডারগুলোর গ্রাহকরা নিয়মিত লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন। বর্তমানে বিয়ানীবাজার উপজেলায় বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ২৬ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ ঘাটতি থাকায় বাধ্য হয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় পালাক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে বিয়ানীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডিজিএম পার্থ চক্রবর্তী জানান, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে দিন-রাতের প্রায় অর্ধেক সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখতে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন না বাড়লে এই সংকট দ্রুত কাটানো সম্ভব নয়, তবে পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে, দ্রুত এই ভোগান্তির স্থায়ী সমাধান করা না হলে যেকোনো সময় সাধারণ মানুষ রাজপথে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হতে পারেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয়রা।