
তুমি রবে নীরবে
বিধান চন্দ্র সান্যাল-
শ্রাবণ মাসের ভারী মেঘে আকাশটা আজ থমকে আছে। কলকাতার পুরনো উত্তর লেনের এই পুরনো বাড়িটার দোতলার বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয় সময় বুঝি একশো বছর আগে আটকে আছে। অনিরুদ্ধ জানলার ধারে বসে। তার আঙুলের ফাঁকে একটা ঠান্ডা চায়ের কাপ। চা কখন জুড়িয়ে গেছে, সে খবর তার নেই। সে তাকিয়ে আছে গলির মোড়ের দিকে। আজ ঠিক পাঁচ বছর হলো মেঘা চলে গেছে। অনিরুদ্ধর জীবনটা একটা মাপা ঘড়ির মতো চলত। গানই ছিল তার সব। সে খেয়ালের শিল্পী। সুরের সাধনা তার রক্তে। কিন্তু মেঘা ছিল অন্যরকম। মেঘা কথা কম বলত, তার চোখ দুটো ছিল গভীর। অনিরুদ্ধ যখন চড়া গলায় সুর তুলত, মেঘা তখন জানলার ধারে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকত। সে কোনো দিন বাহবা দিত না, শুধু তার চাউনিতে সমস্ত গানটা সার্থক হয়ে উঠত।
অনিরুদ্ধর মনে পড়ে প্রথম পরিচয়ের দিনটি। এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে এক বন্ধুর বসার ঘরে মেঘার গান শোনা। মেঘার গলায় কোনো ওস্তাদি মারপ্যাঁচ ছিল না, ছিল নিখাদ আকুতি। অনিরুদ্ধ বলেছিল, “তোমার সুরে প্রাণের টান আছে, ব্যাকরণ নেই।” মেঘা হেসেছিল। সেই হাসির রেশ ধরে দুজনে কাছাকাছি এসে ছিল। বিয়েও হয়েছিল একদিন। কিন্তু গান আর নীরবতা কি কখনো এক চালে চলে? অনিরুদ্ধ চেয়ে ছিল তার গান চারদিকে ছড়িয়ে পড়ুক। সে আসরে নামুক, নাম করুক। মেঘা চেয়ে ছিল ঘরোয়া কোণে সেই সুর কেবল দুজনের মনের গভীরে বাজুক।
মতপার্থক্য বাড়ল। অনিরুদ্ধর ব্যস্ততা বাড়ল। কনসার্ট, স্টুডিও, অটোগ্রাফ আর চারপাশের কোলাহল অনিরুদ্ধকে গ্রাস করল। আর মেঘা দিনে দিনে আরও চুপচাপ হয়ে গেল। সে যেন ঘরের কোণের এক টুকরো ছায়া। অনিরুদ্ধ ভেবেছিল মেঘা বুঝি তার সাফল্যের সঙ্গী হতে চায় না। সে মেঘার নীরবতাকে অবহেলা ভেবে ভুল করল। একদিন মেঘা একটা ছোট চিঠি রেখে চলে গেল। তাতে লেখা ছিল “তোমার বিশাল আকাশে আমার এই ছোট নীরবতা মানায় না। তুমি তোমার গান নিয়ে থাকো, আমি না হয় নীরবতাই রইলাম।”
আজ পাঁচ বছর কেটে গেছে। অনিরুদ্ধ আজ অনেক উঁচুতে। তার নামডাক হয়েছে। সে দেশ-বিদেশ ঘুরে গান গায়। কিন্তু যখনই সে স্টেজের লাইট নিভে যাওয়ার পর ঘরে ফেরে, তখন চারপাশের এই শূন্যতা তাকে কামড়ে খায়। সে বুঝতে পেরেছে, সে যাকে অবহেলা ভেবেছিল, সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুর। রবীন্দ্রনাথের সেই গানটা আজ তার মনে বাজে “তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম।”
বাইরে বৃষ্টি নামল। টাপুর টুপুর শব্দ। অনিরুদ্ধ পিয়ানোটার সামনে বসল। সে কোনো ভারী রাগ তুলল না। সে কেবল একটা সাধারণ সুর বাজাতে শুরু করল। ঠিক যেমনটা মেঘা ভালোবাসত। সে বুঝতে পারল, মেঘা শারীরিকভাবে দূরে, কিন্তু তার সেই না-বলা কথাগুলো, তার উপস্থিতিহীন উপস্থিতি আজ এই ঘরের প্রতিটা কোণায় জমে আছে।
দরজায় একটা মৃদু টোকা পড়ল। অনিরুদ্ধ চমকে উঠল। এত রাতে কে আসবে? সে দরজা খুলে দেখল কেউ নেই। শুধু বারান্দার রেলিংয়ে ভেজা হাওয়ায় একটা রজনীগন্ধা ফুল পড়ে আছে। মেঘা ঠিক এই ফুলটা ভালোবাসত। অনিরুদ্ধ ফুলটা হাতে তুলে নিল। তার চোখে জল এল না। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে বুঝল, কিছু মানুষ থাকে যারা ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যায় না, তারা হৃদয়ের গভীরে চিরকাল নীরবেই থেকে যায়। জে/এ
