রবিবার ২রা আগস্ট, ২০২৬ ১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩

হৃদয়ের সীমানা পেরিয়ে: অভিন্ন সংস্কৃতি ও মৈত্রীর বন্ধনে ভারত ও বাংলাদেশ

[print_bangla]

বিধান চন্দ্র সান্যাল-

বন্ধুত্ব কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বা সীমানার বেড়াজালে আবদ্ধ নয়। এটি মন থেকে মনে প্রবাহিত এক অদৃশ্য অনুভূতির নাম, যার ব্যাকরণ তৈরি হয় পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান আর ভালো লাগার ওপর ভিত্তি করে। ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে যখন দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং তাদের কোটি কোটি মানুষ একই আত্মিক সূত্রে নিজেদের বেঁধে ফেলে, তখন তা কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিসরে আটকে থাকে না, বরং তা পরিণত হয় এক সুমহান মৈত্রীতে। বন্ধু দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে যখন আমরা ব্যক্তিগত সম্পর্কের হিসাব মেলাই, ঠিক তখনই বড় প্রয়োজন হয়ে পড়ে সমসাময়িক বাস্তবতায় প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্র—ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও আবেগঘন বন্ধুত্বের মূল্যায়ন করা। এই দুই দেশের মৈত্রী কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এর শেকড় ছড়িয়ে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, মাটি, ভাষা এবং সংস্কৃতির গভীরতম স্তরে।
ভারত ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে মিল রয়েছে, তা পৃথিবীর খুব কম প্রতিবেশী দেশের মধ্যেই দেখা যায়। দুই দেশেরই দৈনন্দিন মুখের ভাষা বাংলা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান আর কাজী নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা সমান ভাবে অনুরণিত হয় কলকাতার কফি হাউসে এবং ঢাকার ধানমন্ডির আড্ডায়। আমাদের আনন্দ, আমাদের বেদনা, আমাদের উৎসব-সবকিছুর রঙ প্রায় একই রকম। বৈশাখী মেলা, পহেলা বৈশাখ কিংবা দুর্গাপূজা ও ঈদের আনন্দ দুই বাংলার মানুষের মনকেই সমানভাবে আন্দোলিত করে। খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে পোশাক-আশাক, লোকসংস্কৃতি থেকে শুরু করে মার্জিত ধ্রুপদী শিল্পকলা-সব জায়গায় রয়েছে এক অদ্ভুত মিল। লালন শাহের আধ্যাত্মিক বাণী কিংবা হাসন রাজার গান দুই দেশেরই মাটি ও মানুষের আত্মাকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। এই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান কোনো সরকারি নির্দেশ বা প্রটোকলের অপেক্ষা রাখে না। মানুষের হৃদয় থেকে হৃদয়ের এই স্বতঃস্ফূর্ত যোগাযোগই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় এবং শক্ত ভিত্তি।
ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং ঐতিহাসিক অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ভারত সরকার এবং ভারতের সাধারণ মানুষ। প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে, অন্ন-বস্ত্র ও চিকিৎসা সেবা দিয়ে এবং পরবর্তীতে যৌথভাবে লড়াই করে ভারত যে মানবতার ও বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
সেদিনের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে দুই দেশের সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ এক অবিনশ্বর সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল। কলকাতার পার্ক সার্কাস কিংবা ত্রিমোহনীর মাঠ-সব জায়গায় সাধারণ ভারতীয় বাঙালিরা বুক পেতে আশ্রয় দিয়ে ছিলেন ওপারের ভাইবোনদের। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ভারত প্রমাণ করেছিল যে প্রকৃত বন্ধু বিপদের দিনে পিছপা হয় না। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দুই দেশের জনগণের মনে এক গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ ও পারস্পরিক ভালোবাসার জন্ম দিয়েছে যা আজও অম্লান।
সময়ের পরিবর্তনে বন্ধুত্ব আজ নতুন রূপ নিয়েছে। বর্তমান যুগে দুই দেশের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একে অপরের আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। ক্রিকেট মাঠে দুই দলের রোমাঞ্চকর লড়াই যেমন দুই দেশের গ্যালারিকে উত্তাল করে, তেমনি কোনো ভারতীয় গায়কের কনসার্ট ঢাকায় বা কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের আইপিএল খেলা ভারতে সমান উন্মাদনা তৈরি করে। আজকের যুবসমাজ সীমানার দেয়াল ভেঙে একে অপরের বন্ধু হয়ে উঠছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ ভারতে যান, আবার ভারত থেকেও মানুষ আসেন সংস্কৃতির টানে। এই নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত দুই দেশের মানুষের ভুলত্রুটি বা ভুল বোঝাবুঝিগুলোকে দূর করে বন্ধুত্বের পরিসরকে আরও প্রসারিত করছে।
যেকোনো গভীর সম্পর্কেই ছোটখাটো মতপার্থক্য বা ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ থাকা স্বাভাবিক। নদীমাতৃক এই অঞ্চলে পানিবণ্টন বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো কিছু অমীমাংসিত বিষয় থাকতে পারে, কিন্তু দুই দেশের সাধারণ মানুষের মনের মৈত্রী এই সমস্ত বাধা অতিক্রম করার শক্তি জোগায়। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আলোচনার পাশাপাশি যদি ‘পিপল টু পিপল কন্টাক্ট’ বা জনসচেতনতামূলক মেলবন্ধন আরও জোরদার করা যায়, তবে যেকোনো জটিলতাই সহজে সমাধান করা সম্ভব। দুই দেশের অর্থনীতি এবং বাণিজ্যের প্রসার আজ দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধিকে নতুন গতি দিচ্ছে। মৈত্রী সেতু কিংবা আন্তঃসীমান্ত জ্বালানি পাইপলাইনের মতো প্রকল্পগুলো কেবল দুটি দেশের অবকাঠামোই যুক্ত করছে না, বরং দুই দেশের মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ ও সুন্দর করে তুলছে।
বন্ধু দিবসের এই বিশেষ ভাবনায় দাঁড়িয়ে আমরা এ কথাই বলতে পারি যে, ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব কোনো ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি দুই দেশের মাটি ও মানুষের অন্তরের অন্তস্তল থেকে উঠে আসা এক অকৃত্রিম আবেগ। যতদিন সুর থাকবে, যতদিন বাংলা ভাষা উচ্চারিত হবে, যতদিন দুই দেশের নদীর ঢেউয়ে জীবনের গান বাজবে, ততদিন এই মৈত্রীর বন্ধন অক্ষুণ্ণ থাকবে। সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে দুই দেশের জনগণ হাত ধরে এগিয়ে যাবে এক শান্তিময়, সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে-যেখানে বিভেদের কোনো স্থান নেই, আছে কেবল ভালোবাসার জয়গান। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হৃদয়ের সীমানা পেরিয়ে: অভিন্ন সংস্কৃতি ও মৈত্রীর বন্ধনে ভারত ও বাংলাদেশ

০২ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top