মঙ্গলবার ২৮শে জুলাই, ২০২৬ ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩

আড়াইশো বছরের আমেরিকা:একজন প্রবাসীর তিন দশকের খতিয়ান

[print_bangla]

আকবর হায়দার কিরন-

চলতি বছর আমেরিকা তার গৌরবময় ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। কোয়ার্টার-মিলেনিয়াম বা আড়াইশো বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় এই দেশ বিশ্বকে দিয়েছে এক নতুন দিগন্ত। আর এই আড়াইশো বছরের ইতিহাসের শেষ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি এই মহাদেশের একজন প্রত্যক্ষদর্শী, একজন সক্রিয় অংশীদার। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন জীবনের খতিয়ান মেলাতে গিয়ে দেখি—আমার নিজের কোনো বাড়ি নেই, ঝাঁ চকচকে কোনো গাড়ি নেই। কিন্তু বুকভরা এক অদ্ভুত শান্তি আর সন্তুষ্টি আছে। আমি ভালো আছি, চমৎকার আছি। আর এই ভালো থাকার শক্তিটাই আমাকে আজ এই শুভক্ষণে উচ্চকণ্ঠে বলতে শেখায়-লং লিভ আমেরিকা!
আমেরিকায় আমার জীবনের গল্পটা দ্বিমুখী নদীর মতো, যা দুটি ভিন্ন ধারাকে একসাথে ধারণ করেছে। এর একটা ধারা মিশে আছে আমেরিকার মূলধারার ব্যস্ততম রিটেইল লাইনে, আর অন্য ধারাটি প্রবাহিত হয়েছে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ও সাংবাদিকতার জগতে। পেশাগত জীবনের বড় একটা সময় আমি কাটিয়েছি ডুয়েন রীড এবং রাইট এইডের মতো আমেরিকার খ্যাতনামা রিটেইল চেইনের স্টোর ম্যানেজার হিসেবে। রিটেইলের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন আমি হাজারো সাধারণ আমেরিকানকে দেখেছি। চিনেছি তাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবন, তাদের উৎসবের আনন্দ, মন্দার আমলের উদ্বেগ আর মানুষের প্রতি মানুষের নিখাদ ভালোবাসা। এই রিটেইল জীবনই আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে অতি সাধারণ একজন আমেরিকানও অন্যের স্বাধীনতা ও অধিকারকে শ্রদ্ধা করতে জানে।
আমেরিকার এই কর্মব্যস্ত জীবনের সমান্তরালেই চলেছে আমার ভেতরের চিরন্তন বাঙালি সত্তা ও সাংবাদিকতার তাড়না। দীর্ঘ সময় ভয়েস অব আমেরিকার নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুবাদে আমেরিকার রাজনীতির অন্দরমহল থেকে শুরু করে প্রবাসীদের সুখ-দুঃখের কথা ইথারে ভাসিয়েছি। দেড় যুগ আগে প্রতিষ্ঠা করেছিলাম ‘সাউথ এশিয়ান রাইটার্স এন্ড জার্নালিস্টস ফোরাম’, উদ্দেশ্য ছিল আমাদের দক্ষিণ এশীয় লেখকদের কণ্ঠকে এই মুক্তদেশে আরও জোরালো করা। সম্পাদনা করেছি অধুনালুপ্ত ‘বিদেশ বাংলা’, কাজ করেছি বাংলা টিভি নিউ ইয়র্কের সংবাদ পরিচালক হিসেবে। এক সময় দেশের মাটিতে সাড়া জাগানো সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও সাপ্তাহিক ২০০০-এর যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি হিসেবেও যুক্ত ছিলাম। বর্তমানে দীর্ঘদিন ধরে ‘নিউ ইয়র্ক বাংলাডটকম’-এর সম্পাদনার দায়িত্বে থেকে প্রবাসের প্রতিটি খবরের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছি।
গণমাধ্যমের এই দীর্ঘ পথচলায় ১৫ বছর আগে নিহার সিদ্দিকীকে সাথে নিয়ে গড়ে তুলেছিলাম ‘কিরন টিভি’, আর সম্প্রতি অবসরের এই সুন্দর দিনগুলোতে শুরু করেছি নতুন শো ‘কফি উইথ কিরন’। বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে আমার প্রকাশিত ৭টি বই-ই হয়তো প্রবাসে আমার রেখে যাওয়া কিছু স্মৃতির চিহ্ন। আমেরিকা আমাকে বস্তুগত প্রাচুর্য বা অট্টালিকা দেয়নি ঠিকই, কিন্তু যা দিয়েছে তার মূল্য অপরিসীম—তা হলো মত প্রকাশের অবারিত স্বাধীনতা, কাজের স্বীকৃতি এবং সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার এক সুন্দর পরিবেশ। এখানে কোনো কাজই ছোট নয়, আর এই আত্মমর্যাদাবোধই আমেরিকার আসল সৌন্দর্য। ২৫০ বছরের এই বুড়ো ঈগলের ডানার নিচে এসে আমার মতো কত শত যাযাবর যে নিজের ঘর খুঁজে পেয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অবসর জীবনের এই শান্ত বিকেলে দাঁড়িয়ে কোনো আফসোস নেই, কোনো শূন্যতা নেই। কেবল আছে এক গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ। এই দেশ আমাদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে শিখিয়েছে। আমেরিকার ২৫০ বছর পূর্তির এই ঐতিহাসিক ক্ষণে দাঁড়িয়ে একজন গর্বিত প্রবাসী হিসেবে স্যালুট জানাই এই পুণ্যভূমিকে। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আড়াইশো বছরের আমেরিকা:একজন প্রবাসীর তিন দশকের খতিয়ান

০৫ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top