
মাকসুদুল হক, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি-
রণক্ষেত্র থেকে ফসলের মাঠ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের তীব্রতা যখন তুঙ্গে, তখন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিপুল পরিমাণ তাজা সবজির। এই রসদ সরবরাহের ঠিকাদারি পান কলকাতার তৎকালীন প্রখ্যাত ব্যবসায়ী ও সরকারি ঠিকাদার হেমেন্দ্রনাথ দত্ত। রসদের জোগান নিশ্চিত করতে ১৯৪০ সালে তিনি নিজের পৈত্রিক এলাকা ঝিনাইদহের মহেশপুরের নিভৃত পল্লী দত্তনগরে প্রায় ৩ হাজার একর জমি কিনে গড়ে তোলেন এক সুবিশাল ব্যক্তিগত খামার। যোগাযোগ ব্যবস্থা আদিম থাকায় উৎপাদিত তাজা সবজি দ্রুত কলকাতায় পাঠাতে তিনি খামারের ভেতরেই নিজস্ব হ্যালিপ্যাড তৈরি করেন, যেখান থেকে সরাসরি হেলিকপ্টারে করে সবজি উড়ে যেত সেনানিবাসে।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর হেমেন দত্ত কলকাতায় চলে গেলে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং ১৯৬২ সালে নবগঠিত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে এর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা হস্তান্তর করা হয়। পাঁচ খামারের এক মহাজোট: ভৌগোলিক ব্যাপ্তি ও বিন্যাস বর্তমানে এই খামারের মোট জমির পরিমাণ ২,৭৩৭ একর, যার মধ্যে প্রায় ২,৫০০ একর জমি সরাসরি চাষ যোগ্য। নিচু জমি আছে প্রায় ৬০০ একর এবং ১ শত একরেরও বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে বিশাল বিল এলাকা। প্রশাসনিক ও নিবিড় উৎপাদন তদারকির সুবিধার্থে সমগ্র অঞ্চলকে ৫টি স্বাধীন ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে। ইউনিটগুলো হলো-পাতিলা খামার, গোকুলনগর খামার, করিঞ্চা খামার, মথুরা খামার এবং কুশাডাঙ্গা খামার। এর সিংহভাগ অংশ ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় পড়লেও, এর সীমানা ছুঁয়ে গেছে পার্শ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলাকে।
আধুনিকায়ন: সেচ ব্যবস্থা ও যান্ত্রিক কৃষি মান্ধাতা আমলের কৃষি পদ্ধতিকে পেছনে ফেলে দত্তনগর আজ আধুনিক প্রযুক্তির এক অনন্য উদাহরণ। নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহের জন্য এই খামারে বসানো হয়েছে ৩৬ টি গভীর নলকূপ, ১৩ টি অগভীর নলকূপ এবং ১০ টি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পাওয়ার পাম্প। অপচয় রোধে ক্ষেতে পানি সরবরাহের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ পাকা ড্রেন বা ক্যানেল। অতীতে হাজার হাজার শ্রমিক দিয়ে কাস্তে হাতে ফসল কাটা ও মাড়াই করা হতো। এখন খামারটিতে কম্বাইন হারভেস্টার, আধুনিক ট্রাক্টর এবং মেকানিক্যাল থ্রেসার ব্যবহারের মাধ্যমে রোপণ থেকে শুরু করে কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ স্বয়ংক্রিয় ভাবে সম্পন্ন হয়।
জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান দত্তনগর কৃষি খামারকে বলা হয় বাংলাদেশের “ভিত্তি বীজের কারখানা”। প্রতি বছর এখানে বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরি ও মাঠের নিবিড় তত্ত্বাবধানে প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন উচ্চ মানসম্পন্ন ভিত্তি বীজ উৎপাদিত হয়। উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড ধান, উন্নত জাতের গম, আলু, পাট, মুগ ডাল, ভুট্টা এবং সরিষার বীজ উৎপাদনে এটি অনন্য। মূল কৃষি খামারের পাশাপাশি এখানে রয়েছে একটি বড় গবাদি পশুর খামার, যা দেশের দুগ্ধ ও মাংসের চাহিদা মেটাতে কাজ করছে। খামারের নিজস্ব বিশাল বিলে উৎপাদিত হচ্ছে উন্নত জাতের মাছের পোনা। খামারের স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও প্রতিদিন প্রায় ১,৫০০ স্থানীয় কৃষি শ্রমিক এখানে জীবিকা নির্বাহ করেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছে। নিবিড় জলাভূমি ও পরিযায়ী পাখির মেলা: প্রকৃতির এক অন্য ক্যানভাস শুষ্ক মৌসুমে, বিশেষ করে শীত ও বসন্তের দিনগুলোয়, দত্তনগর খামার এক নয়নাভিরাম রূপ ধারণ করে। এখানকার দিগন্ত জোড়া ফসলি মাঠের পাশাপাশি অনন্য এক মাত্রা যোগ করে খামারের নিজস্ব প্রায় দুই শত একরেরও বেশি সুবিশাল নিবিড় জলাভূমি ও বিল এলাকা। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই সুদূর সাইবেরিয়া ও হিমালয় অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এখানে ডানা মেলে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি। সরালি, বালিহাঁস, পিনটেল আর কাদাখোঁচার মতো নানা জাতের অতিথি পাখির কলকাকলি ও ডানা ঝাপটানোর শব্দে নির্জন জলাভূমিগুলো এক জীবন্ত প্রাণ প্রাচুর্যে ভরে ওঠে।
এই বিলগুলোর একপাশে যখন পাখিদের অবাধ বিচরণ, অন্য পাশে তখন চলে বিশাল মাঠের কর্মযজ্ঞ। কোথাও আধুনিক ট্রাক্টর দিয়ে চলছে জমি চাষের ব্যস্ততা, কোথাও কৃষকেরা ব্যস্ত বীজতলা থেকে কচি সবুজ চারা তোলায়, আবার ঠিক তার পাশেই দুলছে কাটার উপযোগী সোনালী ধানের শিষ। ফসলের জীবনচক্র আর জীব বৈচিত্র্যের এমন মেলবন্ধন একই ক্যানভাসে দেখার বিরল দৃশ্য দেশের আর কোথাও মেলা ভার, যা উপভোগ করতে শীতকালে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের ভিড় জমে ওঠে।
পরিবেশের ভারসাম্য ও বিপন্ন হিমালয়ী শকুন: এক ট্র্যাজিক অধ্যায় দত্তনগরের এই জীব বৈচিত্র্য কেবল ছোট পাখিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানে পরিবেশের এক অনন্য ও বিপন্ন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দেখাও মিলেছে। সম্প্রতি শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে সুদূর হিমালয় অঞ্চল থেকে উড়ে আসা বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় হিমালয়ী গৃধিনী জাতের একটি বিশালাকার শকুন মহেশপুর উপজেলার নাটিমা গ্রামের মাঠে তীব্র অসুস্থ ও অবসন্ন অবস্থায় ডানা ভেঙে পড়ে যায়। নাটিমা গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন প্রথম শকুনটিকে মাঠের মধ্যে ছটফট করতে দেখে পরম মমতায় উদ্ধার করে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। পরবর্তীতে স্থানীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মাধ্যমে খবর পেয়ে মহেশপুর উপজেলা বন বিভাগ এবং উপজেলা প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর দ্রুত পাখিটিকে উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। তবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তি ও জখমের কারণে অবলা পাখিটিকে বাঁচানো যায়নি। কিন্তু এর পরিবেশগত গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে মৃত শকুনটিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মমি বা ট্যাক্সিডার্মি করা হয়। বর্তমানে ঝিনাইদহ সরকারি কেশব চন্দ্র (কেসি) কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রদর্শনের জন্য এটি পরম যত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি যেমন এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ জীব বৈচিত্র্যের প্রমাণ দেয়, ঠিক তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের আরও সচেতন হওয়ার বার্তা দিয়ে যায়।
স্থানগত কৌশল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-গবের্ষণাগার প্রতিষ্ঠার অপরিহার্যতা দত্তনগর খামারের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিদ্যমান অবকাঠামো একে একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চশিক্ষা ও বিশ্বমানের গবেষণাগার গড়ে তোলার জন্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে। ভৌগোলিক অবস্থানে এই খামারের একটি অংশ চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমানা ছুঁয়ে গেছে এবং এটি মেহেরপুর জেলার অত্যন্ত নিকটবর্তী। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলা শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই খামারের সাথে পার্শ্ববর্তী দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশন ও চুয়াডাঙ্গার সুবাদে সারাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সরাসরি সংযুক্ত রয়েছে। ফলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের এখানে অত্যন্ত সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত রয়েছে।
একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশেষায়িত কেন্দ্রীয় গবেষণাগার স্থাপনে দত্তনগরের যৌক্তিকতা ও গুরুত্ব নিচে তুলে ধরা হ’ল: বিশাল ল্যাবরেটরি ও ফসলি জমি: সাধারণত নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় করতে শত শত একর জমি অধিগ্রহণে সরকারের বিপুল অর্থ ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। অথচ দত্তনগরের সরকারি মালিকানাধীন প্রায় ৩ হাজার একর জমির বিশাল সাম্রাজ্য নতুন কোনো জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্যাম্পাস ও বিশাল প্র্যাক্টিক্যাল ফিল্ড তৈরির জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বিদ্যমান আধুনিক উৎপাদন অবকাঠামো: এই খামারে ইতিমধ্যে ছড়িয়ে আছে সর্বাধুনিক সেচ ক্যানেল ব্যবস্থা, কম্বাইন হারভেস্টার, পাওয়ার থ্রেসার ও মেকানিক্যাল ল্যাবরেটরি। ফলে অ্যাকাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা একদম প্রথম দিন থেকেই আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সাথে সরাসরি যুক্ত হতে পারবে, যা দেশের অন্য কোনো বিদ্যাপীঠে সম্ভব নয়। উচ্চতর বীজ ও জিন গবেষণাগার (R&D Center) এর অভাব পূরণ: জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় খরা-সহিষ্ণু ও লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশে নিবিড় কৃষি গবেষণাগারের বড় অভাব রয়েছে। দত্তনগর যেহেতু দেশের মূল “ভিত্তিবীজের কারখানা”, তাই এখানে একটি উচ্চতর গবেষণাগার স্থাপন করা হলে জিনতত্ত্ব (Genetics) ও টিস্যু কালচার গবেষণায় এক অভূতপূর্ব বিপ্লব আসবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তর: ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও যশোর অঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান সবজি ও শস্য ভাণ্ডার। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগার গড়ে উঠলে স্থানীয় চাষিরা সরাসরি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরামর্শ পাবেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করতে বড় ভূমিকা রাখবে। এই অভাবনীয় স্থানগত সুবিধা, ভৌগোলিক ভারসাম্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যের কারণেই এই নিভৃত জনপদে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও আধুনিক গবেষণাগার গড়ে তোলার দাবি আজ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সচেতন মহলের একটি সর্বজনবিদিত ও অতি যৌক্তিক গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। জে/এ
