
মাকসুদুল হক, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে রূপ বদলেছে ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহী গজার বিল। গত কয়েকদিনের আগাম ও আচমকা বৃষ্টিতে শুষ্ক বিলে জমেছে সামান্য পানি। আর এই নতুন পানির ছোঁয়ায় বিলের বুকে আনাগোনা শুরু হয়েছে নানা প্রজাতির অতিথি ও পরিযায়ী পাখির। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখিদের কলকাকলি আর ডানা মেলার নান্দনিক দৃশ্যে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো বিল এলাকা।
সরেজমিনে গজার বিলে গিয়ে দেখা যায়, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত জলরাশির মাঝে জেগে থাকা সবুজ ঘাস আর নতুন পানির সংযোগস্থলে আশ্রয় নিয়েছে হাজারো পাখি। সাধারণত শীতকালে এ দেশে অতিথি পাখির আগমন ঘটলেও, এবার অসময়ের আগাম বৃষ্টি গজার বিলের চেনা রূপকে বদলে দিয়েছে। বিলে পানি আসায় জলজ উদ্ভিদ, ছোট মাছ ও শামুকের সহজলভ্যতা তৈরি হয়েছে, যা পাখিদের আকৃষ্ট করছে।
বিলের চারপাশে এখন ডানা মেলছে সরালি, পানকৌড়ি, বক ও বালিহাঁস। তবে এবারের আগাম পানিতে সবচেয়ে বেশি আগমন ঘটেছে বড় আকৃতির এক বিশেষ পাখির, স্থানীয়রা যাকে ‘শামুকভাঙা’ (শামুকখোল) নামে ডাকে। বিলের নতুন পানিতে ভেসে ওঠা শামুক ও ঝিনুক ভেঙে খাওয়ার বিশেষ দক্ষতার কারণেই এখানে এই পাখির নাম হয়েছে ‘শামুকভাঙা’। কখনো তারা আকাশে দল বেঁধে উড়ছে, আবার কখনো শান্ত জলে গা ভাসিয়ে খাদ্যের সন্ধান করছে। পাখিদের এই কিচিরমিচির শব্দে বিলপাড়ের মানুষের ক্লান্তি যেন নিমেষেই দূর হয়ে যাচ্ছে।
একসময় শরতের প্রথম প্রভাতে কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হতো গজার বিল। আরোল, সারোল, বেলে হাঁস, চেগা, কামিনী, কালিমসহ নাম না জানা হাজারো পাখির মিলনমেলা অবলীলায় মন ভরিয়ে দিত সাধারণ মানুষের। কিন্তু বিগত দুই দশকে জলবায়ু পরিবর্তন, মানবসৃষ্ট বিপর্যয় ও জলাশয় সংকোচনের কারণে গজার বিল তার এই জীববৈচিত্র্য অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল। তবে আশার কথা হলো, গত তিন-চার বছরে এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিলটি আবার তার চেনা রূপ ফিরে পেতে শুরু করেছে। প্রকৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা, পর্যাপ্ত পানির কারণে গজার বিল আবারও আগের মতো পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠবে।
বিলের এই রূপ দেখে স্থানীয় প্রবীণদের কণ্ঠে এখন ঝরছে স্মৃতিচারণ আর কিছুটা আফসোস। স্থানীয়রা স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, একসময় ছোটবেলায় গজার বিলে নৌকা চড়ে শাপলা তোলা, ড্যাপের মোয়া খাওয়া, শালুক তোলা আর পদ্ম পাতায় জল ছিটিয়ে খেলা করার আনন্দই ছিল আলাদা। সারাদিন বিলের পানিতে ভিজে ভিজে বুনো হাঁসের ডিম কুড়ানো আর ফেরার সময় শাপলার লতি তুলে বগলদাবা করে বাড়ি ফেরাটা সে সময়ের শিশুদের কাছে ছিল এক পরম বীরত্ব ও বাহাদুরির কাজ। দীর্ঘ দুই দশক পর আবারও ‘শামুকভাঙা’সহ নানাবিধ পাখির আগমন প্রবীণদের মনে সেই শৈশবের পুরনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।
পাখির এই আগমন যেমন আনন্দ ছড়াচ্ছে, তেমনি সচেতন মহলে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। কিছু অসাধু শিকারি সুযোগ বুঝে বিষটোপ বা জাল পেতে এই অতিথি পাখি শিকারের চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা। তাদের মতে, এই পাখিরা আমাদের প্রকৃতির অংশ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান বশির উদ্দিন আশা ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা আমাদের শৈশবের সেই সোনালী অতীত আবার ফিরে পাবো। সুদূর সাইবেরিয়া থেকে যেসব অতিথি পাখি আসতো, পরিবেশ অনুকূলে থাকায় আবার তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। শুধু গজার বিলই নয়, বরং কাকল বিলসহ ঝিনাইদহের সকল বিল আবারও পরিযায়ী পাখিদের কল-কাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।” তিনি আরও জানান, পাখিদের নিরাপদ বিচরণ ও শিকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
ঝিনাইদহ জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জলাশয়গুলোতে নতুন পানি ও খাদ্যের সন্ধান পেলে পরিযায়ী পাখিরা সাময়িকভাবে সেখানে আশ্রয় নেয়। গজার বিলে পাখির এই আগমন জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। পাখি শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ এবং কেউ যেন কোনোভাবে এই পাখিদের ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিটির কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
আগাম বৃষ্টির এই আশীর্বাদে গজার বিল এখন যেন এক জীবন্ত পাখির স্বর্গরাজ্য। এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে এবং পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।