বৃহস্পতিবার ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩

অসমাপ্ত কোলাজ

[print_bangla]

অসমাপ্ত কোলাজ
বিধান চন্দ্র সান্যাল-

পোখরা হ্রদের শান্ত নীল জল তখন বিকেলের নরম রোদে ঝিকমিক করছিল। ঋজু অদৃজার কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলে ছিল, “বিয়েটা করে জীবনে বোধ হয় সব থেকে সঠিক সিদ্ধান্তটা নিলাম, অদৃ। “অদৃজা ওর কাঁধে মাথা রেখে হেসে ছিল। নতুন জীবনের এই কটা দিন যেন কোনো রূপকথার মতো কেটেছে। অদৃজার ক্যামেরার গ্যালারিটা ভরে উঠে ছিল কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দির, ভকতপুরের প্রাচীন গলি আর অন্নপূর্ণা শৃঙ্গের কাঞ্চনছটায়। প্রতিটি ছবিতে মিশে ছিল ওদের সদ্য বিবাহিত জীবনের গাঢ় প্রেম।
পরদিন সকালে ওরা রওনা হয়ে ছিল পাহাড়ি উপত্যকার আরও গভীরে, একটা ছোট্ট নির্জন গ্রামে। মেঘেদের এত কাছাকাছি গিয়ে দুটো দিন নিজেদের মতো করে কাটানোই ছিল উদ্দেশ্য। পাহাড়ি নদীটার পাশেই ছিল ওদের কাঠের কটেজ। পাহাড়ি নদীটা দেখতে শান্ত হলেও তার ভেতরের স্রোত ছিল তীব্র। বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই আকাশ কালো করে নামল বৃষ্টি। পাহাড়ে বৃষ্টি নতুন কিছু নয়, তাই ঋজু আর অদৃজা কটেজের বারান্দায় বসেই উপভোগ করছিল সেই দৃশ্য। ঋজু গরম কফির মগে চুমুক দিয়ে বলছিল, “কলকাতায় ফিরে এই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়বে, তাই না?”
ঠিক তখনই এক অদ্ভুত, গম্ভীর গর্জন ভেসে এল উপত্যকা জুড়ে। সেটা সাধারণ মেঘ ডাকার আওয়াজ ছিল না। ওপরের পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে নেমে আসছিল দানবীয় হড়পা বান (Flash Flood)। মুহূর্তের মধ্যে শান্ত নদীটা রূপ নিল এক হিংস্র রাক্ষসে। কাদা, পাথর আর উপড়ানো গাছপালা নিয়ে জলস্তর সেকেন্ডের মধ্যে গ্রাস করতে শুরু করল চারপাশ। “ঋজু, জল নামছে!” অদৃজা চিৎকার করে উঠল।
ঋজু কিছু বুঝে ওঠার আগেই কটেজের একদিকের দেয়াল ভেঙে তীব্র স্রোত ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। ঋজু অদৃজার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরার চেষ্টা করে ছিল। জীবনের শেষ সম্বলটুকুর মতো আঁকড়ে ধরতে চেয়ে ছিল ওর আঙুলগুলো। কিন্তু প্রকৃতির সেই ভয়াল শক্তির সামনে মানুষের প্রেম, প্রার্থনা আর আকুতি বড় অসহায়। “ঋজুউউ” অদৃজার শেষ আর্তনাদটা পাহাড়ি গর্জনের শব্দে তলিয়ে গেল। জলের এক প্রবল ধাক্কায় ওদের হাত দুটো আলগা হয়ে গেল। সেকেন্ডের মধ্যে দু’জনেই ভেসে গেল দুই ভিন্ন স্রোতে।
পাঁচদিন পর। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী উপত্যকার বেশ কিছুটা নিচে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছিল। নিখোঁজ পর্যটকদের তালিকায় ঋজু আর অদৃজার নামটা ততক্ষণে নথিবদ্ধ হয়ে গেছে। কাদার স্তূপ আর পাথরের খাঁজ থেকে উদ্ধারকর্মীরা একটা ভাঙা ডিজিটাল ক্যামেরা খুঁজে পেলেন। অলৌকিক ভাবে সেটার মেমোরি কার্ডটা অক্ষত ছিল। ল্যাপটপে কার্ডটা লাগাতেই স্ক্রিন জুড়ে ভেসে উঠল দুটো হাসিমুখ। বরফে ঢাকা পাহাড়ের পটভূমিতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঋজু আর অদৃজা। প্রকৃতির নিয়মে হয়তো ওদের জীবনের গল্পটা মাঝপথেই হারিয়ে গেল, কিন্তু সেই ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয়ে রইল ওদের এক চিরন্তন, অসমাপ্ত প্রেমের কোলাজ। জে/এ

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অসমাপ্ত কোলাজ

২৯ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top