
এমএফএইচ রাজু | ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার বিহারীলাল মিত্র পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ধূমপানের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এক শিক্ষার্থীকে প্রধান শিক্ষকের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন শিক্ষক শাহআলম। এ সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে টানাহেঁচড়ার একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। তবে ঘটনার দুই দিন পর ভিডিও ধারণকারী শিক্ষার্থী নিজের ভুল বুঝতে পেরে শিক্ষক শাহআলমের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। শিক্ষকও তাকে ক্ষমা করে বুকে টেনে নেন।
ঘটনাটি গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলার বাথরুমের পাশের এলাকায় ঘটে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে ধূমপান করছিল। বিষয়টি শিক্ষক শাহআলমের নজরে এলে তিনি তাদের দিকে এগিয়ে যান। শিক্ষককে দেখতে পেয়ে ধূমপানকারী শিক্ষার্থীরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। তবে তাদের সঙ্গে থাকা এক শিক্ষার্থী শিক্ষকের হাতে ধরা পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই শিক্ষার্থী নিজে ধূমপান করছিল না। তবে ধূমপানকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকায় শিক্ষক তাকে আটক করেন এবং বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে জানানোর জন্য তার কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় শিক্ষক ও ওই শিক্ষার্থীর মধ্যে টানাহেঁচড়া হয়। পাশে থাকা অপর এক শিক্ষার্থী ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষক শাহআলমকে নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একই সময়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি মিছিল বা সমাবেশের ছবি ও ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এমন ধারণা তৈরি হয় যে, শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থী ধরা পড়ার ঘটনার প্রতিবাদেই ওই মিছিল বা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তবে শিক্ষক শাহআলমের দাবি, মিছিল বা সমাবেশটির সঙ্গে শিক্ষার্থীকে আটক করার ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। ঘটনার পর দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, শিক্ষার্থীকে আটক করার ঘটনার প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে বিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে মিছিল বা সমাবেশ করেছিল।
শাহআলমের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে কয়েকজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের নিয়ম অমান্য করে শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে আসে। বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন আনা নিষেধ থাকায় ওই শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন প্রধান শিক্ষকের কাছে জমা রাখা হয়। এর প্রতিবাদেই শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে মিছিল বা সমাবেশ করেছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শিক্ষক শাহআলম আরও দাবি করেন, পরবর্তীতে কিছু সাংবাদিকের প্রচার বা প্রতিবেদনে মোবাইল ফোন জব্দের প্রতিবাদে হওয়া মিছিলের সঙ্গে শিক্ষার্থীকে আটক ও টানাহেঁচড়ার ঘটনাকে একসূত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, তার হাতে শিক্ষার্থী ধরা পড়ার ঘটনার প্রতিবাদেই শিক্ষার্থীরা মিছিল করেছিল।
তার অভিযোগ, পৃথক দুটি ঘটনাকে একসঙ্গে উপস্থাপনের ফলে তার সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে এবং এতে তার সম্মানহানি হয়েছে৷
এদিকে, গত ২৯ আগস্ট ভিডিও ধারণকারী শিক্ষার্থী নিজের ভুল বুঝতে পেরে শিক্ষক শাহআলমের কাছে ক্ষমা চায়। এ সময় শিক্ষকও বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে শিক্ষার্থীকে ক্ষমা করে বুকে টেনে নেন। ওই সময় বিদ্যালয় সংস্কার আন্দোলনের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
উপস্থিত শিক্ষার্থীরা জানান, ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা তথ্য প্রচারের মাধ্যমে শিক্ষক শাহআলমের সম্মানহানি করা হয়ে থাকলে প্রচারকারীদের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।
এদিকে, গত ২৯ আগস্ট বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার ঘটনায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ কারণে ৩০ আগস্ট, রবিবার প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভিডিও ধারণকারী ওই শিক্ষার্থী বলেন, ভাই, ভিডিওতে আপনারা যতটুকু দেখেছেন, আমিও ততটুকুই দেখেছি। স্যার তাকে কলার ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সে যেতে চাচ্ছিল না, তাই এমন করেছিল। পরে স্যার তাকে ছেড়ে দেন এবং সে আবার ক্লাসে চলে যায়।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনায় অন্তত দুটি পৃথক বিষয় সামনে এসেছে। একটি হলো বিদ্যালয়ের বাথরুমের পাশের এলাকায় শিক্ষার্থীদের ধূমপানের ঘটনা এবং তা দেখতে পেয়ে শিক্ষক শাহআলমের প্রতিবাদ ও একজন শিক্ষার্থীকে প্রধান শিক্ষকের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। অন্যটি হলো এর প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন জব্দের প্রতিবাদে বিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে শিক্ষার্থীদের মিছিল বা সমাবেশ।
শিক্ষক শাহআলমের দাবি, পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং কিছু প্রচারে এসব পৃথক ঘটনাকে একসঙ্গে উপস্থাপন করায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সংক্ষিপ্ত ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পুরো ঘটনা ও প্রেক্ষাপট যাচাই না করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিভ্রান্তিকর হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো ঘটনা বা ভিডিও প্রকাশের আগে এর সময়, স্থান, প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের অনিয়মের প্রতিবাদ যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।
অন্যায় বা অনিয়ম যে পক্ষেরই হোক, তার প্রতিবাদ হওয়া উচিত। ব্যক্তি নয় ঘটনার প্রকৃত সত্য, প্রেক্ষাপট ও দায়ই সামনে আসা প্রয়োজন।