বুধবার ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩

নদী শাসন:কৃষিতে প্রভাব

[print_bangla]

ড. সরকার আবুল কালাম আজাদ – 

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। নদী যেমন কৃষিজমিতে পলি এনে মাটির উর্বরতা বাড়ায়, তেমনি অতিরিক্ত পানি, নদী ভাঙন ও আকস্মিক বন্যার কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ও ফসলের ক্ষতি হয়। তাই নদী শাসন বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে প্রশ্ন হলো-নদী শাসন কি কৃষির জন্য সবসময় আশীর্বাদ, নাকি অপরিকল্পিত নদী শাসন কখনো কখনো কৃষির জন্য অভিশাপও হয়ে উঠতে পারে?
নদী শাসন কেন প্রয়োজন-নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ, তীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও ড্রেজিং, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ভাঙন রোধের বিভিন্ন কার্যক্রমকে সাধারণ ভাবে নদী শাসনের আওতায় ধরা হয়। বাংলাদেশের কৃষিতে এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো কৃষিজমি রক্ষা, বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন। নদী ভাঙনের কারণে প্রতিবছর বহু কৃষক জমি হারান। একটি পরিবার বছরের পর বছর যে জমিতে ফসল ফলিয়েছে, নদীর ভাঙনে মুহূর্তেই তা বিলীন হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় কার্যকর নদী শাসন কৃষিজমি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পার।
কৃষিতে নদী শাসনের ইতিবাচক প্রভাব-প্রথমত, কৃষি জমি রক্ষা করা যায়। নদীর তীর সংরক্ষণ ও সঠিক পরিকল্পনায় বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ভাঙন কমানো সম্ভব হলে কৃষকের জমি ও বসতভিটা রক্ষা পায়। এতে কৃষকের উৎপাদন অব্যাহত থাকে এবং ভূমিহীন হওয়ার ঝুঁকি কমে।
দ্বিতীয়ত, বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত পানি দীর্ঘদিন জমে থাকলে ধান, সবজি, ডাল, তেলবীজসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়। পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় নদী খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা গেলে জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন নদী শাসনের একটি বড় সুবিধা হতে পারে। নদীর পানি পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা গেলে শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকট কমে। বিশেষ করে বোরো ধান, সবজি, ভুট্টা ও অন্যান্য রবি ফসলের উৎপাদনে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চতুর্থত, নদীর নাব্যতা বজায় থাকলে পানি চলাচল ও কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হয়। নৌপথে স্বল্প খরচে কৃষিপণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়ে এবং পরিবহন ব্যয় কমে। তবে নদী শাসনের নেতিবাচক দিকও আছে এখানেই শুরু হয় গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক। নদীকে শুধু বাঁধ, পাড় ও কংক্রিট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নদী একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। তার পানি প্রবাহ, পলি বহন এবং চর গঠন-সবকিছুর সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে নদীবাহিত পলির ভূমিকা ঐতিহাসিক। নদীর স্বাভাবিক প্লাবন অনেক এলাকায় নতুন পলি জমিয়ে মাটিকে উর্বর করে। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ফলে যদি নদীর পলি কৃষি জমিতে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা কমে যেতে পারে এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।
অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের আরেকটি সমস্যা হলো জলাবদ্ধতা। কোনো একটি এলাকায় পানি আটকানো হলেও অন্য এলাকায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেলে কৃষিজমিতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। ফলে একদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্প অন্যদিকে কৃষির ক্ষতির কারণ হতে পারে। আরেকটি বড় বিষয় হলো নদীর গতিপথ পরিবর্তন। একটি স্থানে বাঁধ বা তীর সংরক্ষণ করা হলে নদীর স্রোতের চাপ অন্য স্থানে গিয়ে পড়তে পারে। ফলে এক এলাকার জমি রক্ষা পেলেও পাশের এলাকায় ভাঙন বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নদী শাসনকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পুরো নদীর প্রবাহ ও অববাহিকা বিবেচনায় নিয়ে করতে হবে।
যুক্তি হলো-নদীকে শাসন নয়, নদীর সঙ্গে সহাবস্থান
নদী শাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শন হওয়া উচিত-‘নদীকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নয়, নদীর স্বাভাবিক গতিকে বিবেচনায় রেখে ব্যবস্থাপনা।’ প্রকৌশলগত অবকাঠামোর পাশাপাশি নদীর পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় নিতে হবে। কোথায় বাঁধ প্রয়োজন, কোথায় তীর সংরক্ষণ জরুরি, কোথায় ড্রেজিং করা দরকার এবং কোথায় নদীকে স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে দেওয়া উচিত-এসব সিদ্ধান্ত নিতে হবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে। একই সঙ্গে কৃষকদের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ। যে কৃষক বছরের পর বছর নদীর চরিত্র, পানি ওঠানামা ও ফসলের পরিবর্তন দেখেছেন, তার অভিজ্ঞতাকে নদী ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানো উচিত।
কৃষি বান্ধব নদী ব্যবস্থাপনার করণীয়-নদী শাসনকে কৃষিবান্ধব করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নদীর নাব্যতা ও পানি প্রবাহ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় স্থানে বৈজ্ঞানিক ভাবে ড্রেজিং করতে হবে। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় টেকসই তীর সংরক্ষণ করতে হবে। পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত খাল, কালভার্ট ও স্লুইসগেটের ব্যবস্থা রাখতে হবে। বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু বাঁধ তৈরি করলেই হবে না; নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পানি ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পরিকল্পনা থাকতে হবে। চর ও নদীতীরবর্তী এলাকায় বন্যা সহনশীল ফসল, স্বল্পমেয়াদি জাত এবং ভাসমান কৃষির মতো অভিযোজনমূলক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
নদী বাংলাদেশের কৃষির শত্রু নয়; বরং সঠিক ব্যবস্থাপনায় নদী কৃষির অন্যতম বড় সম্পদ। নদী যেমন ভাঙন ও বন্যার মাধ্যমে কৃষকের ক্ষতি করে, তেমনি পলি, পানি ও সেচের সুযোগ দিয়ে কৃষিকে সমৃদ্ধও করে। অতএব নদী শাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু নদীর পানি আটকানো বা নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা নয়; বরং কৃষি জমি রক্ষা, পানি ব্যবস্থাপনা, মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ এবং নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা। সঠিক পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনায় নদী শাসন হতে পারে কৃষকের নিরাপত্তার ঢাল। আর অপরিকল্পিত নদী শাসন হলে তা কৃষির জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। তাই সময়ের দাবি-‘নদীকে জয় নয়, নদীকে বুঝে কৃষির স্বার্থে নদীর সঙ্গে সহাবস্থান।’

ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ, কেন্দ্রীয় সভাপতি
বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন (BPF),
কৃষি লেখক, কথক-বাংলাদেশ বেতার।

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নদী শাসন:কৃষিতে প্রভাব

৩১ আগস্ট ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top