ফারুয়ায় ২৫০ ফুটের বেইলি ব্রিজ নির্মাণে উন্নয়ন বোর্ডের হস্তক্ষেপ কামনা করেন বিএনপি সভাপতি সালাম ফকির

[print_bangla]

সুজন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, রাঙামাটি জেলা প্রতিনিধিঃ

রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ তক্তানালা থেকে রোয়াপাড়াছড়া যাওয়ার মাঝামাঝি ডেবাছড়া এলাকায় একটি ২৫০ ফুট দীর্ঘ বেইলি ব্রিজ/ স্থায়ী স্টীল ব্রিজ নির্মাণ করা হলে বদলে যেতে পারে পাঁচ গ্রামের প্রায় ৮ হাজার মানুষের জীবনযাত্রা। দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের ব্রিজ দিয়ে চলাচল করে আসছেন স্থানীয়রা। কিন্তু বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তাঁরা। এলাকাবাসীর দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে একটি স্থায়ী বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করা হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ তক্তানালা থেকে সীমান্ত সড়ক হয়ে রোয়াপাড়াছড়া যাওয়ার পথে ডেবাছড়া এলাকায় স্থানীয় পাড়াবাসীর উদ্যোগে নির্মিত কাঠের ব্রিজটি ভেঙে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ব্রিজের বিভিন্ন স্থানের কাঠের তক্তা নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পানি জমে জলাশয়ের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙা কাঠের ওপর দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। যেকোনো সময় ব্রিজটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
কৃষক ভুবনজয় তঞ্চঙ্গ্যা জানান, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে শত শত মানুষ চলাচল করেন। এলাকার অধিকাংশ মানুষের ধানখেত ও বাগান ব্রিজের দুই পাশে অবস্থিত। কিন্তু এ বছর ব্রিজটি সংস্কার না হওয়ায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যেকোনো মুহূর্তে এটি ভেঙে যেতে পারে। বিকল্প কোনো পথও নেই। ব্রিজের মাঝখানের অনেক তক্তা নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষিপণ্যসহ প্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহন করতে না পারলে এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়বেন। স্থানীয় আরও কয়েকজন পথচারীও একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

ভারতচন্দ্র কার্বারী জানান, কয়েক বছর আগে ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে এখানে একটি কাঠের ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছিল। কাঠের ব্রিজ দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ায় প্রতিবছর পাড়াবাসী পরিবারপ্রতি চাঁদা তুলে গাছ ও তক্তা কিনে সেটি মেরামত করে আসছেন। এতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। কিন্তু এ বছর পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় অনেকের ধানখেত, বাগান ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আর্থিক সংকটের কারণে কেউ কেউ টাকা দিতে পারলেও অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে অর্থ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, এই কাঠের ব্রিজ দিয়েই এলাকার মানুষ কৃষিপণ্য মূল সড়কে নিয়ে যান। সেখান থেকে রাজস্থলী হয়ে শহরে এসব পণ্য পরিবহন করা হয়। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে কলা, ফরাস শিম, বাদাম, আদা, হলুদ ও ঝাড়ুফুলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এসব পণ্য দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। এ ছাড়া অসুস্থ রোগী ও প্রসূতি মায়েদেরও এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ায় প্রতিদিন শতাধিক পরিবারে হাজার মানুষ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয় মহিলা ইউপি সদস্য মনিলতা তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ব্রিজটি তক্তানালা থেকে রোয়াপাড়াছড়া যাওয়ার পথে অবস্থিত হলেও ফুঁছড়া, উলুছড়ি, মাইত কুমা পাড়া ও উত্তর পাড়ার বাসিন্দারাও নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করেন। কোনো কোনো সময় ওরাছড়ি ও ফারুয়া এলাকার মানুষও এ পথে চলাচল করেন। সব মিলিয়ে পাঁচ গ্রামের প্রায় ৮ হাজার মানুষ নানা প্রয়োজনে এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই ব্রিজ দিয়ে যাতায়াত করেন। বর্ষাকালে পানির উচ্চতা বেড়ে ব্রিজের নিচের অংশ অনেকটা দীঘির মতো হয়ে যায়। এতে পারাপারের স্থানে পানির গভীরতাও বেড়ে যায়। ব্রিজ ভেঙে কেউ পানিতে পড়ে গেলে এবং সাঁতার না জানলে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া কয়েক কিলোমিটার পথ শ্রমিক দিয়ে মালামাল পরিবহন করাও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। বিকল্প কোনো পথ না থাকায় এখানে একটি স্টিল বা বেইলি ব্রিজ নির্মাণ জরুরি। মনিলতা তঞ্চঙ্গ্যা আরও বলেন, ব্রিজটি নির্মাণ করা হলে সরাসরি যানবাহন চলাচল করতে পারবে। সংযোগ সড়কেরও বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে পাকা করা হয়েছে। ফলে একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মিত হলে এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহনেও ব্যাপক সুবিধা হবে।

ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল চেয়ারম্যান বলেন, এই স্থানে ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ থেকে কাঠের ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং একাধিকবার মেরামতও করা হয়েছে। শুধু পাড়াবাসীই ব্রিজটি মেরামত করেন—এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। তবে স্থানটি দীর্ঘ হওয়ায় এখানে পাকা বা স্টিলের ব্রিজ নির্মাণ ব্যয়বহুল। কাঠের ব্রিজ নির্মাণ করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। স্থায়ীভাবে একটি পাকা বা স্টিলের ব্রিজ নির্মাণ করা গেলে এলাকার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে। তিনি আরও বলেন, ওই স্থানে পাকা বা স্টিলের ব্রিজ নির্মাণ করা গেলে সীমান্ত সড়কের রোয়াপাড়াছড়া থেকে দক্ষিণ তক্তানালা পাড়া পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজও সহজ হবে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফরহাদ হোসেন জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সর্বোচ্চ ৫০ ফুট পর্যন্ত ব্রিজ নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু ডেবাছড়া এলাকায় প্রায় ২৫০ ফুট দীর্ঘ ব্রিজ প্রয়োজন। তাই অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমেও স্টিল ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভি দাশ জানান, প্রায় ২৫০ ফুট দীর্ঘ একটি নতুন বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য বেশি বরাদ্দের প্রয়োজন হবে এবং আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময় লাগবে। তবে স্থানীয়ভাবে কাঠের ব্রিজটি মেরামত করা হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম ফকির বলেন, বিলাইছড়ির যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ফারুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট কাঠের ব্রিজ রয়েছে। এসব ব্রিজ বারবার মেরামত করতে হয়, ফলে সরকারি ও ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় হয়। দীর্ঘমেয়াদে কাঠের ব্রিজ নির্মাণ করে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি গুরুত্বপূর্ণ যে সবস্থানে বেইলি ব্রিজ নির্মাণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের সুদৃষ্টি কামনা করেন। তিনি আরও বলেন,মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও কৃষি পণ্য সুবিধার্থে ডেবাছড়া এলাকায় একটি বেইলি ব্রিজ দ্রুত নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত বেইলি ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

Share this news as a Photo Card

Share it :

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফারুয়ায় ২৫০ ফুটের বেইলি ব্রিজ নির্মাণে উন্নয়ন বোর্ডের হস্তক্ষেপ কামনা করেন বিএনপি সভাপতি সালাম ফকির

১১ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
dailybadwipbangladesh
www.badwipnews.com
Scroll to Top