
ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ-
সরিষা আমাদের দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল জাতীয় ফসল। অল্প সময়ে সরিষা চাষ করে কৃষক বাড়তি আয় করতে পারেন। বিশেষ করে আমন ধান কাটার পর জমিতে সরিষা চাষ করলে একই জমিতে বছরে অতিরিক্ত একটি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। তবে ভালো ফলন পেতে হলে উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার, সঠিক সময়ে বপন, পরিমিত সার প্রয়োগ এবং নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে।
১. জমি নির্বাচন ও প্রস্তুতি-
দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি সরিষা চাষের জন্য ভালো। জমিতে যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জমির মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকলে আমন ধান কাটার পর দ্রুত সরিষা বপন করা যায়। জমি ভালোভাবে তৈরি করলে বীজ সহজে গজায় এবং গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়।
২. ভালো বীজ ও উন্নত জাত নির্বাচন-
সরিষা চাষে ভালো ফলনের জন্য উন্নত জাতের বিশুদ্ধ বীজ ব্যবহার করতে হবে। এলাকার মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে উপযোগী জাত নির্বাচন করা জরুরি। এ জন্য কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে বারি বা বিনা উদ্ভাবিত উপযোগী জাতের বীজ সংগ্রহ করা যেতে পারে। বীজ কেনার সময় বীজের মান ও মেয়াদ যাচাই করতে হবে।
৩. সঠিক সময়ে বীজ বপন-
সরিষা চাষে সময় মতো বীজ বপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত কার্তিক থেকে অগ্রহায়ণ মাস সরিষা বপনের উপযুক্ত সময়। তবে জাত ও এলাকার আবহাওয়া অনুযায়ী বপনের সময় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। আমন ধান কাটার পর জমিতে রস থাকতে থাকতেই সরিষা বপন করলে ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
৪. সারিতে বীজ বপন করুন-
সরিষার বীজ ছিটিয়ে অথবা সারিতে বপন করা যায়। তবে সারিতে বপন করলে গাছের পরিচর্যা, আগাছা দমন ও সার প্রয়োগ করা সহজ হয়। বীজ খুব ঘন করে বপন করা উচিত নয়। গাছ বেশি ঘন হলে আলো-বাতাস কম পায় এবং ফলন কমে যেতে পারে। তাই জাত ও বপনপদ্ধতি অনুযায়ী বীজের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।
৫. সঠিক নিয়মে সার প্রয়োগ-
ভালো ফলন পেতে জমিতে সুষম সার দিতে হবে। সরিষার জন্য ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, সালফার ও বোরনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে জমির উর্বরতা ও জাতভেদে সারের পরিমাণ আলাদা হতে পারে। তাই মাটি পরীক্ষা করে অথবা স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার দিলে খরচ বাড়ে, কিন্তু সব সময় ফলন বাড়ে না।
৬. আগাছা পরিষ্কার ও জমির পরিচর্যা-
সরিষার চারা ছোট থাকা অবস্থায় জমিতে আগাছা জন্মালে গাছ প্রয়োজনীয় খাবার ও আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত হয়। তাই সময় মতো আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। পাশাপাশি জমিতে পানি জমছে কি না এবং গাছের বৃদ্ধি স্বাভাবিক হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত দেখতে হবে।
৭. প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিন-
সরিষা চাষে সাধারণত বেশি পানির প্রয়োজন হয় না। তবে মাটিতে রসের অভাব হলে প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা সেচ দিতে হবে। বিশেষ করে ফুল আসা ও দানা গঠনের সময় মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকা দরকার। আবার জমিতে অতিরিক্ত পানি জমতে দেওয়া যাবে না। এতে গাছের ক্ষতি হতে পারে।
৮. রোগ ও পোকামাকড় দমনে সতর্ক থাকুন-
সরিষার জমিতে জাবপোকা ও বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। তাই নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রোগ বা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে দ্রুত স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া কীটনাশক ব্যবহার করবেন না। ওষুধ প্রয়োগ করতে হলে অনুমোদিত ওষুধ সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে এবং লেবেলের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
৯. সময় মতো সরিষা কাটুন-
জাতভেদে সাধারণত ৭৫ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে সরিষা কাটার উপযোগী হয়। গাছ ও শুঁটি হলদে বা বাদামি রং ধারণ করলে এবং অধিকাংশ দানা পরিপক্ব হলে ফসল সংগ্রহ করতে হবে। বেশি দেরি করলে শুঁটি ফেটে সরিষার দানা জমিতে ঝরে পড়তে পারে। ফসল কাটার পর ভালো ভাবে শুকিয়ে পরিষ্কার ও শুকনো জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে।
কৃষকের জন্য বিশেষ পরামর্শ-
সরিষা চাষে বেশি লাভ করতে হলে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে-ভালো বীজ ব্যবহার, সময় মতো বপন, সুষম সার প্রয়োগ, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ এবং রোগ-পোকা দমনে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ। একই সঙ্গে অযথা সার ও কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমানো এবং লাভ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
শেষ কথা: সরিষা চাষ শুধু কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস নয়, দেশের ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই পতিত জমি ও আমন ধান কাটার পর উপযোগী জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে সরিষা চাষ বাড়াতে হবে। জে/এ
ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ
কৃষি লেখক এবং কেন্দ্রীয় সভাপতি
বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন (BPF)
